ঢাকা ০৫:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লেমুয়া বাজারের শতবর্ষের পাঁটি শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে, হারাচ্ছে ঐতিহ্যের গৌরব

Reporter Name
  • Update Time : ০৭:১৩:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৯ Time View
Print

মোহাম্মদ হানিফ স্টাফ রিপোর্টার ফেনী জেলা।

একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের প্রধান গন্তব্য ছিল লেমুয়া বাজার; আধুনিক পণ্যের দাপট, কাঁচামালের সংকট ও কারিগরের অভাবে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পাঁটি শিল্প

ফেনীর লেমুয়া বাজার একসময় ছিল ঐতিহ্যবাহী পাঁটি শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। উন্নতমানের হাতে তৈরি পাঁটির জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় জমাতেন। স্থানীয় অর্থনীতি ও হাজারো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই শিল্প এখন সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
একসময় গ্রামীণ জনপদের অসংখ্য পরিবার বাড়ির আঙিনা, উঠান কিংবা বারান্দায় বসে নারী-পুরুষ মিলে নানা ধরনের পাঁটি তৈরি করতেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই হস্তশিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যমই ছিল না, বরং ছিল লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আশির দশকে, বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের দিকে, লেমুয়া বাজারে বিভিন্ন মান ও আকারের পাঁটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে আসাম বটনি, ধারা, বটনি (মাঝারি), চাড়াই ও বড় পাঁটির ব্যাপক চাহিদা ছিল। সে সময় আসাম বটনির দাম ছিল ৫ থেকে ৭ টাকা, ধারা ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মাঝারি বটনি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, চাড়াই ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং বড় পাঁটির মূল্য ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দক্ষ কারিগরদের একটি উন্নতমানের পাঁটি তৈরি করতে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, ফোম ও মেশিনে তৈরি ম্যাটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় হাতে তৈরি পাঁটির চাহিদা কমে যায়। একই সঙ্গে কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ বিলুপ্তির মুখে।
একসময় যে লেমুয়া বাজারে সারিবদ্ধভাবে পাঁটির দোকান দেখা যেত, সেখানে এখন সেই দৃশ্য প্রায় অতীত। অনেক অভিজ্ঞ কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে বয়সের ভারে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সমৃদ্ধ লোকজ শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস।
প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই ব্যস্ত হাটের দিনের কথা। ভোর থেকেই জমে উঠত কেনাবেচা, আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা মানসম্মত পাঁটি কিনে নিয়ে যেতেন। লেমুয়া বাজার তখন ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাঁটি বিপণন কেন্দ্র।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, লেমুয়া বাজারের পাঁটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক বাজারজাতকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের কার্যকর ব্র্যান্ডিং। তাদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
একসময় লেমুয়া বাজারের নাম উচ্চারিত হতো মানসম্মত পাঁটির জন্য। সেই গৌরব আজ অনেকটাই ম্লান হলেও এই শিল্প সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

লেমুয়া বাজারের শতবর্ষের পাঁটি শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে, হারাচ্ছে ঐতিহ্যের গৌরব

Update Time : ০৭:১৩:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
Print

মোহাম্মদ হানিফ স্টাফ রিপোর্টার ফেনী জেলা।

একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের প্রধান গন্তব্য ছিল লেমুয়া বাজার; আধুনিক পণ্যের দাপট, কাঁচামালের সংকট ও কারিগরের অভাবে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পাঁটি শিল্প

ফেনীর লেমুয়া বাজার একসময় ছিল ঐতিহ্যবাহী পাঁটি শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। উন্নতমানের হাতে তৈরি পাঁটির জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় জমাতেন। স্থানীয় অর্থনীতি ও হাজারো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই শিল্প এখন সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
একসময় গ্রামীণ জনপদের অসংখ্য পরিবার বাড়ির আঙিনা, উঠান কিংবা বারান্দায় বসে নারী-পুরুষ মিলে নানা ধরনের পাঁটি তৈরি করতেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই হস্তশিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যমই ছিল না, বরং ছিল লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আশির দশকে, বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের দিকে, লেমুয়া বাজারে বিভিন্ন মান ও আকারের পাঁটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে আসাম বটনি, ধারা, বটনি (মাঝারি), চাড়াই ও বড় পাঁটির ব্যাপক চাহিদা ছিল। সে সময় আসাম বটনির দাম ছিল ৫ থেকে ৭ টাকা, ধারা ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মাঝারি বটনি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, চাড়াই ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং বড় পাঁটির মূল্য ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দক্ষ কারিগরদের একটি উন্নতমানের পাঁটি তৈরি করতে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, ফোম ও মেশিনে তৈরি ম্যাটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় হাতে তৈরি পাঁটির চাহিদা কমে যায়। একই সঙ্গে কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ বিলুপ্তির মুখে।
একসময় যে লেমুয়া বাজারে সারিবদ্ধভাবে পাঁটির দোকান দেখা যেত, সেখানে এখন সেই দৃশ্য প্রায় অতীত। অনেক অভিজ্ঞ কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে বয়সের ভারে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সমৃদ্ধ লোকজ শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস।
প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই ব্যস্ত হাটের দিনের কথা। ভোর থেকেই জমে উঠত কেনাবেচা, আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা মানসম্মত পাঁটি কিনে নিয়ে যেতেন। লেমুয়া বাজার তখন ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাঁটি বিপণন কেন্দ্র।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, লেমুয়া বাজারের পাঁটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক বাজারজাতকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের কার্যকর ব্র্যান্ডিং। তাদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
একসময় লেমুয়া বাজারের নাম উচ্চারিত হতো মানসম্মত পাঁটির জন্য। সেই গৌরব আজ অনেকটাই ম্লান হলেও এই শিল্প সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা।