ভালো পিচ ঢালাই তুলে ইটের সলিং! কালীগঞ্জে ৮৮ লাখ টাকার ‘উল্টো রথের’ রহস্যময় উন্নয়ন
- Update Time : ০৬:০৯:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
- / ১৪ Time View

রাসেল হোসেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-
উন্নয়ন সাধারণত পেছনের দিকে যায় না, কিন্তু ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যেন এক অভিনব ‘উল্টো রথের’ যাত্রা শুরু হয়েছে। যেখানে কাঁচা রাস্তা পাকা করার জন্য মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, সেখানে কালীগঞ্জ-গান্না সড়কের ঝকঝকে পাকা পিচ রাস্তা খুঁড়ে তৈরি করা হচ্ছে ইটের সলিং! মাত্র সাড়ে ৮শ মিটার সড়কের এই ‘রহস্যময়’ মহাযজ্ঞে বাজেট ধরা হয়েছে সামান্য নয়—পুরো ৮৮ লাখ টাকা! ভালো রাস্তা ধ্বংস করে ইটের রাজত্ব কায়েমের এই অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখে স্থানীয়দের চোখ এখন চড়কগাছ।
সড়কটির কালীগঞ্জ নিমতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে আলাইপুর গ্রাম পর্যন্ত অংশ ঘুরে দেখা গেছে এক অদ্ভুত দৃশ্য। যে রাস্তা দিয়ে অনায়াসে গাড়ি চলত, সেখানে এখন পিচ-পাথর উপড়ে ফেলে দুই স্তরের ইট বসিয়ে সলিং করা হচ্ছে। পিচ ঢালাই রাস্তা থেকে ইটের সলিংয়ে অবনমন ঘটিয়ে কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যয়ের এই ‘প্রগতিশীল’ পরিকল্পনাকে সাধারণ মানুষ দেখছেন প্রকাশ্য অপচয় হিসেবে। স্থানীয়দের মতে, রাস্তার দু-এক জায়গায় সামান্য ক্ষতি হয়েছিল, যা সামান্য প্যাচওয়ার্ক বা মেরামত করলেই অনায়াসে চলত। কিন্তু তা না করে পুরো রাস্তা ধ্বংস করার এই জেদ কেন, তা কারো মাথায় ঢুকছে না।
প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহনসহ শত শত ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও ছোট-বড় গাড়ি চলাচল করে। এছাড়াও শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এটি। কিন্তু এই ‘উন্নয়ন কামড়’ দেওয়ার পর থেকে পুরো এলাকায় এখন ধুলাবালি আর চরম ভোগান্তির এক নরককুণ্ড তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী তুহিন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তার সিংহভাগই একদম ঠিকঠাক ছিল। সামান্য একটু মেরামত করলেই যেখানে কাজ হতো, সেখানে কোটি টাকার প্রজেক্ট দেখানোর জন্য পুরো ভালো রাস্তাটাই ভেঙে দেওয়া হলো। এটা কেমন যৌক্তিকতা?”
একই সুরে কথা বললেন ইজিবাইক চালক আলিম হোসেন। তিনি বাঁকা হেসে বলেন, “পাকা রাস্তা ভেঙে আমাদের আবার ইটের যুগে ফেরত পাঠানো হচ্ছে! ইটের ওপর দিয়ে গাড়ি চালালে ঝুঁকি আর কষ্ট—দুই-ই বাড়ে। এই কাজ কয়দিন টিকবে তা ঈশ্বরই জানেন।”
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘গামা কনস্ট্রাকশন’-এর স্বত্বাধিকারী গোলাম হোসেন মেম্বার অবশ্য এর মধ্যে কোনো রহস্য দেখছেন না। নিয়মমাফিক জবাব দিয়ে তিনি বলেন, “টেন্ডারে যেভাবে বলা আছে, আমরা ঠিক সেভাবেই কাজ করছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে।” অর্থাৎ, টেন্ডারে যদি পিচ রাস্তা ভেঙে নদী বানানোর কথা থাকে, ঠিকাদার সেটাই করবেন—এমনটাই আভাস তার কথায়।
এই অদ্ভুত প্রকল্পের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী অপূর্ব বিশ্বাসের ব্যাখ্যা আরও চমকপ্রদ। তিনি জানান, বর্ষার পানিতে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাই এটি নাকি ‘রক্ষণাবেক্ষণমূলক’ কাজ! তবে ভালো অংশ কেন ভাঙা হচ্ছে—এমন অপ্রিয় প্রশ্নের জবাবে তিনি বল ঠেলে দেন ওপরের দিকে। তিনি বলেন, “কিছু ভালো অংশও কাজের মধ্যে পড়ে গেছে, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়।”
এখন প্রশ্ন হলো, ভালো রাস্তা ভেঙে ইটের সলিং বানানো যদি ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ হয়, তবে ‘ধ্বংস’ কাকে বলে? ৮৮ লাখ টাকার এই ‘উল্টো উন্নয়ন’ কার পকেট ভারী করতে আর কার মাথা খাটিয়ে করা হয়েছে—কালীগঞ্জবাসীর মনে এখন সেই তীব্র প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।


















