সুনামগঞ্জে উন্মাদনার আড়ালে উদ্বেগ: হাওরপাড়ে বিশ্বকাপ ফুটবল ও দুই শিবিরের লড়াই
- Update Time : ১১:৪৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
- / ৭ Time View

তৌফিকুর রহমান তাহের, বিশেষ প্রতিনিধি (সুনামগঞ্জ)
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে এখনো বাকি, অথচ সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে এখনই শুরু হয়ে গেছে টানটান উত্তেজনা।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ল্যাটিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। তবে এই ফুটবল উন্মাদনা যেখানে শুধুই বিনোদন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা রূপ নিচ্ছে এক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বে।
সমর্থকদের সমীকরণ কার পাল্লা ভারী?
গ্রামের ফুটবলপ্রেমীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সমর্থকদের মাঝে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। হিসাব কষলে দেখা যায়:
আর্জেন্টিনা সমর্থক ৭০% (সিংহভাগ গ্রামের মানুষই আকাশি-সাদা জার্সির ভক্ত)।
ব্রাজিল সমর্থক ২৮% (হলুদ-সবুজ শিবিরের কড়া সমর্থক)।
অন্যান্য দল মাত্র ২% (যারা মূলত পর্তুগাল, ফ্রান্স বা জার্মানি সমর্থন করেন এবং দুই দলের তুমুল তর্কের মাঝে ভিন্ন রকম আনন্দ খোঁজেন)।বিনোদন নাকি আত্মপরিচয়ের সংকট?
খেলা চলাকালীন স্থানীয়দের আবেগ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যা অনেক সময় সাধারণের বোধগম্য হয় না। হাওরপাড়ের অনেক প্রবীণ ও সচেতন মানুষের সাথে আলোচনা করলে এক অদ্ভুত বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের মতে, খেলার সময় মানুষের মন থেকে যেন উবে যায় নিজস্ব ভৌগোলিক পরিচয়।
খেলা যখন চলে, তখন মনেই থাকে না আমরা কোন দেশে বাস করছি। মনে হয় আমরা বাংলাদেশ নয়, বরং ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনায় বাস করছি!” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অপ্রীতিকর ঘটনা
গ্রামের এই অতি-উৎসাহ মাঝে মাঝে রূপ নেয় বিষাদে। বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ঘেঁটে দেখা গেছে, চায়ের দোকানের সাধারণ তর্কবিতর্ক থেকে শুরু করে হাতাহাতি, এমনকি মারামারির মতো অপ্রত্যাশিত ও অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। এক দলের হার ও অন্য দলের জয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বৈরিতা গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে।
স্থানীয়দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া: বিনোদন বনাম সতর্কতা
খেলা নিয়ে এই বাড়াবাড়িকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না এলাকার অনেক সচেতন নাগরিক। কেউ কেউ স্পষ্ট করেই বলছেন, ফুটবল একটা বৈশ্বিক খেলা এবং এটি শুধুই বিনোদনের মাধ্যম। অতি-উৎসাহী হয়ে কারও সাথে বিবাদে জড়ানো বা মন্দ কিছু করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
তবে ফুটবলকে উৎসবের আমেজে দেখার পক্ষেও আছেন অনেকে। গ্রামের ফুটবলপ্রেমী মমিন আলী জানান ভিন্ন এক অনুভূতির কথা। তার মতে, একা একা খেলা দেখার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই।
হাওরপাড়ের মানুষের জীবনে বিনোদনের সুযোগ এমনিতেই সীমিত। তাই ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জনপদে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বিনোদনের এই আনন্দ যেন ঘরের শত্রুতা বা অপ্রীতিকর ঘটনায় রূপ না নেয়, সেদিকে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। খেলা হোক সম্প্রীতির, হানাহানির নয়—এমনটাই প্রত্যাশা সুনামগঞ্জের সচেতন মহলের।



















