ইয়াবার ছোবলে বাড়ছে ভয়াবহ অপরাধ, ঝুঁকিতে পরিবার ও সমাজ
- Update Time : ১১:১৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ২১ Time View

আবু তালেব বিশেষ প্রতিনিধি
ইয়াবা এখন আর শুধু মাদকাসক্তির সমস্যা নয়; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্যও এটি ক্রমেই বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত নৃশংস অপরাধের তদন্তে অভিযুক্তদের ইয়াবা সেবনের তথ্য সামনে আসায় মাদকের ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, সহিংসতা, পারিবারিক অশান্তি থেকে শুরু করে সামাজিক অবক্ষয়—বিভিন্ন সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে মাদকের বিস্তার।
সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায়ও ইয়াবা সেবনের তথ্য সামনে আসে। রংপুর মহানগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রাপ্তি চক্রবর্তী ও ১২ বছরের ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার আগে তারা ওই পরিবারের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাতেও ইয়াবা সেবনের তথ্য সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সোহেল রানা আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ঘটনার আগে ইয়াবা সেবনের কথা জানিয়েছিলেন। মামলার তদন্ত ও আদালতের নথিতে উঠে আসা এই তথ্য ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে অভিযুক্তের মাদক সেবনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাজধানীর দনিয়ায় ব্যবসায়ী আশরাফুল হক হত্যার ঘটনাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াবা সেবনের তথ্য জানিয়েছিল। হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরা করে দুটি ড্রামে ভরে হাইকোর্ট এলাকার কাছে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার আগে প্রধান অভিযুক্ত জরেজুল ইসলাম প্রচুর ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এরপর ইয়াবা সেবনের উত্তেজনার মধ্যে আশরাফুলকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
ইয়াবা কীভাবে শরীর ও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে
ইয়াবার প্রধান উপাদান মেথামফেটামিন একটি শক্তিশালী উত্তেজক মাদক। এটি গ্রহণের পর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। সাময়িকভাবে অতিরিক্ত শক্তি, ঘুম কমে যাওয়া ও ক্ষুধা হ্রাস পেলেও নিয়মিত ব্যবহারে মাদকনির্ভরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও ইয়াবা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ব্যবহারে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, খিঁচুনি, স্ট্রোক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং অতিরিক্ত মাত্রায় মৃত্যুর মতো গুরুতর ঝুঁকিও রয়েছে।
দীর্ঘদিন ব্যবহারে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যের ক্ষতি, ওজন কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা এবং শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যে ভয়াবহ প্রভাব
ইয়াবার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির সমস্যা তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভ্রম ও সাইকোসিসের মতো গুরুতর মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
মেথামফেটামিনের প্রভাবে বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা, অস্বাভাবিক উত্তেজনা ও আগ্রাসী আচরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের কারণ হিসেবে শুধু মাদক সেবনকে দায়ী করা যায় না; অপরাধের পেছনে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, সামাজিক পরিবেশ, পূর্বের আচরণসহ একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।
একজন সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তার প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়তে পারে। তৈরি হতে পারে অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক কলহ, অবিশ্বাস ও সহিংসতা। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
মাদকাসক্তির কারণে পড়াশোনা ও কর্মজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক থেকেও একজন ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কৌতূহল, বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা, সহজলভ্যতা এবং মাদককে বিনোদনের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা অনেককে প্রথমবার মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রথমদিকে সাময়িক উত্তেজনা বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি হলেও নিয়মিত ব্যবহারে শরীর ও মস্তিষ্ক মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। ফলে আগের মতো প্রভাব পেতে ধীরে ধীরে বেশি পরিমাণ মাদক গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
ইয়াবার বিস্তার একটি বড় অবৈধ অর্থনীতিকেও সক্রিয় রাখছে। মাদক বিক্রির সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাত, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লে অপরাধী নেটওয়ার্কে নতুন সদস্য তৈরির আশঙ্কা বাড়ে।
মাদকাসক্তির চক্র থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্য কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পরিবার ও সমাজের অবহেলা এবং চিকিৎসার সুযোগের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইয়াবার ভয়াবহতা তাই শুধু একটি ট্যাবলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব শরীর, মস্তিষ্ক, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবার, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। বিভিন্ন নৃশংস অপরাধের তদন্তে অভিযুক্তদের মাদক সেবনের তথ্য সামনে আসা এই সংকটের একটি দিককে দৃশ্যমান করছে। মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
























