জীবননগর চোরাকারবারে অভিযোগ ও সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি পেলেন সার ডিলারশিপ
- Update Time : ১১:১০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৭ Time View

জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি:চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক আবু সায়েম হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম শিবলু ২০২৬ সালে উপজেলার উথুলী ইউনিয়নে সার ডিলারশিপ পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চোরাকারবার ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত সার ডিলারের তালিকায় উথুলী ইউনিয়নের ‘সাদ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম শিবলুর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সার ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিবলু চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার আলোচিত স্বর্ণ চোরাকারবারি তোতা-মান্নানের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ফেনসিডিলসহ ডিবি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সীমান্তে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে কী মানদণ্ডে শিবলুকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, সাংবাদিক আবু সায়েম হত্যা মামলার আসামির সার ডিলারশিপ পাওয়া উদ্বেগজনক। তাঁদের মতে, নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
জীবননগর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও জীবননগর প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সদস্য আতিয়ার রহমান বলেন, “সরকারের ঘোষণা ছিল, অভিযোগ রয়েছে—এমন কোনো ব্যক্তি সার ডিলারশিপ পাবেন না। একজন চোরাকারবারি ও সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি কীভাবে সার ডিলার হলেন, সেটি বড় প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, কালো টাকার প্রভাব ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। এত অভিযোগ থাকার পরও কীভাবে তিনি ডিলারশিপ পেলেন, তা তদন্ত করা উচিত।”
সাইফুল ইসলাম শিবলুর ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান খোকন বলেন, “এ ব্যাপারে বলার কিছু নেই। উপজেলা কৃষি অফিসের তদন্ত কমিটির দেওয়া তালিকা জেলা বিএনপির সুপারিশে তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।”
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি বলেন, “উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কমিটির সদস্যসচিব। বিষয়টি তিনিই পরিষ্কার করে বলতে পারবেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে এ তালিকা দেওয়া হয়নি; উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেলায় পাঠানো হয়েছে।”
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, “সাইফুল ইসলামের নামে যে মামলার কথা বলছেন, সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই। সার ডিলারশিপের আবেদনের নির্ধারিত শর্তগুলো তিনি পূরণ করায় তাঁর নাম তালিকায় ছিল। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি যাচাই করে তালিকা দেয়। পরে আমরা তা জেলায় পাঠিয়েছি।”
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, সাইফুল ইসলামের নামে মামলা আছে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়নি।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার বলেন, “ডিলারশিপের জন্য একটি কমিটি ছিল। সাইফুল ইসলাম যে চোরাকারবারি ও হত্যা মামলার আসামি, বিষয়টি কমিটির সভায় উপস্থাপন হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ে না। আপনি বিষয়টি জানিয়েছেন, আমরা দেখব।”
তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তির আগে অভিযোগগুলো যাচাই করা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
২০২৬ সালের নতুন সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপজেলা কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজনের নাম জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সুপারিশ করা হয়। পরে তালিকাটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলে জীবননগরে এ নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়।
সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি কীভাবে সার ডিলারশিপ পেলেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—এখন সেই প্রশ্নের জবাব ও বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন স্থানীয়দের অনেকে।


























