ঢাকা ০৩:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিকেলে পাত্রী দেখা, রাতেই নিভে গেল অপুর জীবনের আলো

শ্রী সুপণ বিশ্বাস, রাউজান (চট্টগ্রাম):
  • Update Time : ০১:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৬ Time View
Print

শ্রী সুপণ বিশ্বাস, রাউজান (চট্টগ্রাম):

 

 

বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে দিনটি শুরু করেছিলেন অপু দাশ (২৯)। নতুন জীবনের স্বপ্নে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাগোয়ানের গঙ্গা মন্দিরে তাঁর জন্য পাত্রী দেখা হয়। প্রাথমিকভাবে বিয়ের কথাবার্তাও এগিয়েছিল। স্বজনদের মধ্যে ছিল আনন্দের আবহ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই আনন্দ রূপ নেয় শোকের মাতমে।

হাসপাতালের দায়িত্ব শেষে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন অপু। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পর শুক্রবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে বিয়ের পিঁড়িতে আর বসা হলো না তাঁর।

পাত্রী দেখার কয়েক ঘণ্টা পরই দুর্ঘটনা

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সোয়া ৮টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন কাতালপীর শাহ দরগাহের সামনে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত অপু দাশ রাঙ্গুনিয়া উপজেলার স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের উত্তর সাবেক রাঙ্গুনিয়া গ্রামের বাঘার বাড়ির মৃত বাদল দাশের একমাত্র ছেলে। তিনি রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকার দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালে মার্কেটিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের কাছে অপু ছিলেন মায়ের একমাত্র অবলম্বন। কর্মস্থলেও তিনি সহকর্মীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা।

দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনা

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে দায়িত্ব পালন শেষে নিজ মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন অপু। কিছুক্ষণ পর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে তাঁকে মোটরসাইকেলসহ সড়কের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়।

দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক (মার্কেটিং) এপেক্সিয়ান মৃনাল কান্তি বড়ুয়া বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অপুকে মোটরসাইকেলসহ সড়কের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। তবে কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একটি যানবাহন অপুর মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে। এতে তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।

পরে আহত অপুকে উদ্ধার করে প্রথমে দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

বিকেলের আনন্দ, রাতেই শোক

মৃনাল কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘অপু আমাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর এমন আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে পুরো হাসপাতাল পরিবার শোকাভিভূত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, শুক্রবার বিকেলেই বাগোয়ানের গঙ্গা মন্দিরে তাঁর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে বিয়ের কথাবার্তাও হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সব আনন্দ শোকে পরিণত হয়েছে।’

অপুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একমাত্র ছেলে অপুকে হারিয়ে তাঁর মা শোকে ভেঙে পড়েছেন।

যে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন চলছে কান্না আর আহাজারি। স্বজনদের চোখে-মুখে শুধু হারানোর বেদনা।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে পুলিশ

রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। নিহতের মরদেহ বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাত কোনো যানবাহনের ধাক্কায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে তরুণকে ঘিরে ছিল বিয়ের আনন্দ, নতুন জীবনের স্বপ্ন আর স্বজনদের উচ্ছ্বাস—সেই অপুই রাতের সড়ক দুর্ঘটনায় চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই থেমে গেল ২৯ বছরের অপুর জীবনের পথচলা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

বিকেলে পাত্রী দেখা, রাতেই নিভে গেল অপুর জীবনের আলো

Update Time : ০১:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
Print

শ্রী সুপণ বিশ্বাস, রাউজান (চট্টগ্রাম):

 

 

বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে দিনটি শুরু করেছিলেন অপু দাশ (২৯)। নতুন জীবনের স্বপ্নে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাগোয়ানের গঙ্গা মন্দিরে তাঁর জন্য পাত্রী দেখা হয়। প্রাথমিকভাবে বিয়ের কথাবার্তাও এগিয়েছিল। স্বজনদের মধ্যে ছিল আনন্দের আবহ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই আনন্দ রূপ নেয় শোকের মাতমে।

হাসপাতালের দায়িত্ব শেষে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন অপু। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পর শুক্রবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে বিয়ের পিঁড়িতে আর বসা হলো না তাঁর।

পাত্রী দেখার কয়েক ঘণ্টা পরই দুর্ঘটনা

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সোয়া ৮টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন কাতালপীর শাহ দরগাহের সামনে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত অপু দাশ রাঙ্গুনিয়া উপজেলার স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের উত্তর সাবেক রাঙ্গুনিয়া গ্রামের বাঘার বাড়ির মৃত বাদল দাশের একমাত্র ছেলে। তিনি রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকার দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালে মার্কেটিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের কাছে অপু ছিলেন মায়ের একমাত্র অবলম্বন। কর্মস্থলেও তিনি সহকর্মীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা।

দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনা

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে দায়িত্ব পালন শেষে নিজ মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন অপু। কিছুক্ষণ পর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে তাঁকে মোটরসাইকেলসহ সড়কের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়।

দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক (মার্কেটিং) এপেক্সিয়ান মৃনাল কান্তি বড়ুয়া বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অপুকে মোটরসাইকেলসহ সড়কের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। তবে কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একটি যানবাহন অপুর মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে। এতে তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।

পরে আহত অপুকে উদ্ধার করে প্রথমে দি বিসিসিইউএল জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

বিকেলের আনন্দ, রাতেই শোক

মৃনাল কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘অপু আমাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর এমন আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে পুরো হাসপাতাল পরিবার শোকাভিভূত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, শুক্রবার বিকেলেই বাগোয়ানের গঙ্গা মন্দিরে তাঁর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে বিয়ের কথাবার্তাও হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সব আনন্দ শোকে পরিণত হয়েছে।’

অপুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একমাত্র ছেলে অপুকে হারিয়ে তাঁর মা শোকে ভেঙে পড়েছেন।

যে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন চলছে কান্না আর আহাজারি। স্বজনদের চোখে-মুখে শুধু হারানোর বেদনা।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে পুলিশ

রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। নিহতের মরদেহ বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাত কোনো যানবাহনের ধাক্কায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে তরুণকে ঘিরে ছিল বিয়ের আনন্দ, নতুন জীবনের স্বপ্ন আর স্বজনদের উচ্ছ্বাস—সেই অপুই রাতের সড়ক দুর্ঘটনায় চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই থেমে গেল ২৯ বছরের অপুর জীবনের পথচলা।