শ্রুতিঅঙ্গনের ১৫তম বর্ষের নিয়মিত শাস্ত্রীয়-উপশাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠান
- Update Time : ১০:২০:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৪ Time View

মিলন বৈদ্য শুভ, চট্টগ্রাম:
শ্রুতিঅঙ্গনের ১৫তম বর্ষের নিয়মিত শাস্ত্রীয় ও উপশাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস স্মরণে এক মনোজ্ঞ শাস্ত্রীয়-উপশাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
পার্থ প্রতিম বিশ্বাস ও প্রণিতা দেবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আজাদীর সহযোগী সম্পাদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ রউফ বলেন, বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের মতো অসাম্প্রদায়িক, বিস্ময়কর প্রতিভাবান ও দুর্সাহসিক কবি আর নেই। তিনি নজরুলের সাম্য ও মানবতার চেতনা তুলে ধরে বলেন, “গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” ধর্ম-বর্ণ, জাতি ও দেশ-কালের বিভেদ ভুলে মানবতার জয়গানই ছিল নজরুলের সৃষ্টির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তিনি আরও বলেন, “রবীন্দ্রনাথ হল বাঙালির মাথার উপর ছাতা আর নজরুল হল অন্তরাত্মা।” প্রায় শত বছর আগে নজরুল তাঁর গান, কবিতা, নাটক ও উপন্যাসে দেশাত্মবোধ, নারী জাগরণ, ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত, বিদ্রোহ, গজল, প্রেম, প্রকৃতি, রাগপ্রধান গান, ভাটিয়ালি ও পল্লীগীতিসহ বিভিন্ন ধারার অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি রেখে গেছেন। নতুন প্রজন্মের মাঝে নজরুলের এই সৃষ্টিকর্ম ও মানবতাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে পারলে আকাশ সংস্কৃতির যুগে সমাজের অস্থিরতা, হিংসা ও হানাহানি অনেকাংশে কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে শ্রুতিঅঙ্গনের সভাপতি সুজিত কুমার ভট্টাচার্য সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সকলের অবদানের কথা তুলে ধরেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সহ-সভাপতি শ্যামল বিশ্বাস, অরুণ রায়, প্রণব দে, সঞ্জয় দে প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে মঙ্গলদ্বীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শুরু হয়। অনিল কুমার ঘোষের কথায়, উস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার সুরে এবং লিটন দাশের সংগীতায়োজনে ভৈরবী রাগপ্রধান গান ‘বাজে মোহন বেণু কদম কাননে সখী’ পরিবেশিত হয়। এরপর নজরুলের পটদীপ রাগে ‘হে প্রিয়, আমারে দিব না ভুলিতে’ এবং প্রার্থনা সংগীত ‘অনাদি কাল হতে অনন্ত লোক গাহে তোমারি জয়’সহ ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম’ ও ‘চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা, চাঁদের চেয়েও জ্যোতি’ পরিবেশন করেন শ্রুতিঅঙ্গনের শিল্পীবৃন্দ।
একক সংগীত পরিবেশনায় রাগ মেঘমল্লার ও দাদরা ‘বরষন লাগী সাবন বোধিয়া রাজা’ পরিবেশন করেন শ্রুতিঅঙ্গনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রশিক্ষক লিটন দাশ। তবলায় ছিলেন তিষাণ ঘোষ, হারমোনিয়ামে অনির্বাণ দত্ত এবং তানপুরায় নিপা দত্ত ও নীলকান্ত ভৌমিক।
পরবর্তীতে শিল্পীদের একক পরিবেশনায় একের পর এক মনোমুগ্ধকর গান পরিবেশিত হয়। অনির্বাণ দত্ত পরিবেশন করেন ‘রঞ্জসী শাহী দিলহি দোকান’—গজল, মিশ্র ইমন রাগে। মনস্বিতা চৌধুরী পরিবেশন করেন ‘রঙ্গী সারি গোলাবি চুনেরিয়া’—মিশ্র পাহাড়ি রাগের ঠুমরী। সৃজিতা দে পরিবেশন করেন ‘আয়েনা বালমা কা করু সজনী’—ভৈরবী রাগে।
প্রণিতা দেব পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত ‘চাঁদের মত নিরবে এসো প্রিয়’—শিবরঞ্জনীতে। পুষ্পিতা শীল পরিবেশন করেন ‘এ কেমন রাত্রি এলো ভোর’—রাগপ্রধান গান, দাদরা ও শিবরঞ্জনীতে। নিলয় দত্ত পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত ‘এলো ঐ পূর্ণ শশী’। এছাড়া পাপড়ি দাশের কণ্ঠে ‘সাচি বলো শ্যাম’, মেঘলিনা ঘোষের কণ্ঠে ‘আমার দেয়া ব্যথা ভোলো’, নিপা দত্তের কণ্ঠে ‘দাঁড়ালে দুয়ারে মোর’ এবং দরবারী রাগে গজল ‘মেরে হাম না ফাস মেরে হাম নাবা’, বিনয় দাশের কণ্ঠে নজরুলসংগীত ‘আমার বিফল পূজাঞ্জলি’ পরিবেশিত হয়।
যন্ত্রসংগীতে বাঁশিতে রাহুল সরকার, কিবোর্ডে নিখিলেশ বড়ুয়া, বেহালায় শ্যামল চন্দ্র দাশ, অক্টোপ্যাডে নন্দন নন্দী এবং তবলায় তিষাণ ঘোষ ও শ্রীয়ম দে প্রমুখ শিল্পী সহযোগিতা করেন।
নজরুলের গান ও শাস্ত্রীয় সংগীতের সুরে পুরো আয়োজনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে সংগীতপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে থিয়েটার ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক মনোরম সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টি হয়।

























