ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৮ টাকায় কেনা বায়োস্কোপে ৫০ বছর কেটে গেল আগৈলঝাড়ার প্রবীণ শিল্পী সর্বানন্দ মধু

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৩১:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১ Time View
Print

মো:আশরাফ বরিশাল ক্রাইম রিপোর্টার:-

“কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা, কায়দার কায়দা বাক্সের ভেতর দুনিয়া আছে,দেইখ্যা যান মন ভইরা”ঘুরাই দিলাম কায়দার চাকা,দেখতে হলে লাগবে টাকা”কায়দা রে কায়দা ওরে কায়দার কায়দা
এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় ভাষায় বরিশালের আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু।
৫০ বছরের অধিক সময় ধরে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে সর্বানন্দ মধু। অভাব অনাটনের কারনে এক সময় নিজের লেখা-পড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খাওয়া সর্বানন্দ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেলা বা অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভাই বোন ও সন্তানদের লেখা পড়া করানোর পাশাপাশি কিনেছেন জায়গা জমি। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা মেলা বা পার্বনে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভালো আছেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় ঐতিহ্য চেনাতে এখনো কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে ঘুরে বেড়ায় সে। বিলুপ্তপ্রায় এই বায়োস্কোপ দেখিয়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের সংসার চালাচ্ছেন সর্বানন্দ। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৮১ বছর। ৫ ভাই বোনের মধ্যে সর্বানন্দ মধু মেঝো ভাই। বাবা ছিলেন কাটমিন্ত্রী তাই অভাবের কারনে পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি। বাবার কাছে কাটমিন্ত্রীর কাজ শিখে কৈশোরেই একজন দক্ষ কাটমিন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে ৫০ বছর পূর্বে তার বয়স যখন ৩০ বছর তখন যশোর জেলার বোনাপোল এলাকায় কাট মিস্ত্রীর কাজের সময় ওই এলাকার একজনের কাছ থেকে ১৮ টাকায় ক্রয় করে বায়োস্কোপটি। যার নাম দেন “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ”। রঙ্গরস ও আকর্ষনীয় কথার ছন্দে এক হাতে ডুগডুগি অন্য হাত দিয়ে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আশ পাশের গ্রাম ও স্থানীয় মেলায় কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ
দেখাতে শুরু করেন তিনি। সেই শুরু, এরপর পিছনে আর তাকাতে হয়নি তাকে। তার কথার ছন্দে আকৃষ্ট হয়ে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পেছন পেছন ছুটত শিশু-কিশোররা। প্রথম জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, পশুপাখিসহ নানান চিত্র দিয়ে বায়োস্কোপ দেখাতেন তিনি। তার এই বায়োস্কোপে এক সঙ্গে দেখতে পারেন ৫ জন দর্শক। প্রথম প্রথম চাল বা ৫ পয়সা থেকে ১০ পয়সা এরপর ৫০ পয়সা দিলেই দেখাতেন বায়োস্কোপ। গ্রামগঞ্জের হাট ও মেলায় অনুষ্ঠান ছাড়াও বায়োস্কোপ দেখানো হতো পাড়া-মহল্লায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির আগমনে বায়োস্কোপ এখন বিলীন প্রায়। তবে থেমে নেই সর্বানন্দের “কায়দার কায়দা” বায়োস্কোপ দেখানো। বর্তমানে নিজ এলাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মেলা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখান তিনি। আর সর্বানন্দের এই বায়োস্কোপ দেখতে গুনতে হয় জন প্রতি ১০ টাকা। কেউ কেউ আবার খুশি হয়ে একটু বেশিও দেয়। এতে আয় হয় হাজার ১২শ টাকা। শুধু শিশু-কিশোররাই নয়, সর্বানন্দের “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ” দেখেন নানান বয়সের লোকজন। এভাবেই “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ” দেখাতে দেখাতে সর্বানন্দ এখন পরিচিতি পেয়েছে “কায়দার কায়দা” নামে। লাল বাক্সের সামনের দিকে দুই পাশে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ প্রতিটি মুখেই লেন্স লাগানো। আর বাক্সের ভেতর কাপড়ে লাগানো থাকে ছবি। কাপড়টা পেঁচানো থাকে পাশের দুটি কাঠিতে। কাঠির ওপরের মাথায় বাক্সের বাইরে লাগানো থাকে একটা হ্যান্ডেল। এই হ্যান্ডেল ঘোরালে ছবিসহ কাপড়টা একপাশ থেকে গিয়ে আরেক পাশে পেঁচাতে থাকে। এ ভাবেই দিন কেটে যায় সর্বানন্দ মধুর।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

১৮ টাকায় কেনা বায়োস্কোপে ৫০ বছর কেটে গেল আগৈলঝাড়ার প্রবীণ শিল্পী সর্বানন্দ মধু

Update Time : ০৮:৩১:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
Print

মো:আশরাফ বরিশাল ক্রাইম রিপোর্টার:-

“কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা, কায়দার কায়দা বাক্সের ভেতর দুনিয়া আছে,দেইখ্যা যান মন ভইরা”ঘুরাই দিলাম কায়দার চাকা,দেখতে হলে লাগবে টাকা”কায়দা রে কায়দা ওরে কায়দার কায়দা
এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় ভাষায় বরিশালের আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু।
৫০ বছরের অধিক সময় ধরে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে সর্বানন্দ মধু। অভাব অনাটনের কারনে এক সময় নিজের লেখা-পড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খাওয়া সর্বানন্দ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেলা বা অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভাই বোন ও সন্তানদের লেখা পড়া করানোর পাশাপাশি কিনেছেন জায়গা জমি। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা মেলা বা পার্বনে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ভালো আছেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় ঐতিহ্য চেনাতে এখনো কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে ঘুরে বেড়ায় সে। বিলুপ্তপ্রায় এই বায়োস্কোপ দেখিয়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের সংসার চালাচ্ছেন সর্বানন্দ। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৮১ বছর। ৫ ভাই বোনের মধ্যে সর্বানন্দ মধু মেঝো ভাই। বাবা ছিলেন কাটমিন্ত্রী তাই অভাবের কারনে পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি। বাবার কাছে কাটমিন্ত্রীর কাজ শিখে কৈশোরেই একজন দক্ষ কাটমিন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে ৫০ বছর পূর্বে তার বয়স যখন ৩০ বছর তখন যশোর জেলার বোনাপোল এলাকায় কাট মিস্ত্রীর কাজের সময় ওই এলাকার একজনের কাছ থেকে ১৮ টাকায় ক্রয় করে বায়োস্কোপটি। যার নাম দেন “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ”। রঙ্গরস ও আকর্ষনীয় কথার ছন্দে এক হাতে ডুগডুগি অন্য হাত দিয়ে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আশ পাশের গ্রাম ও স্থানীয় মেলায় কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ
দেখাতে শুরু করেন তিনি। সেই শুরু, এরপর পিছনে আর তাকাতে হয়নি তাকে। তার কথার ছন্দে আকৃষ্ট হয়ে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পেছন পেছন ছুটত শিশু-কিশোররা। প্রথম জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, পশুপাখিসহ নানান চিত্র দিয়ে বায়োস্কোপ দেখাতেন তিনি। তার এই বায়োস্কোপে এক সঙ্গে দেখতে পারেন ৫ জন দর্শক। প্রথম প্রথম চাল বা ৫ পয়সা থেকে ১০ পয়সা এরপর ৫০ পয়সা দিলেই দেখাতেন বায়োস্কোপ। গ্রামগঞ্জের হাট ও মেলায় অনুষ্ঠান ছাড়াও বায়োস্কোপ দেখানো হতো পাড়া-মহল্লায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির আগমনে বায়োস্কোপ এখন বিলীন প্রায়। তবে থেমে নেই সর্বানন্দের “কায়দার কায়দা” বায়োস্কোপ দেখানো। বর্তমানে নিজ এলাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মেলা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখান তিনি। আর সর্বানন্দের এই বায়োস্কোপ দেখতে গুনতে হয় জন প্রতি ১০ টাকা। কেউ কেউ আবার খুশি হয়ে একটু বেশিও দেয়। এতে আয় হয় হাজার ১২শ টাকা। শুধু শিশু-কিশোররাই নয়, সর্বানন্দের “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ” দেখেন নানান বয়সের লোকজন। এভাবেই “কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ” দেখাতে দেখাতে সর্বানন্দ এখন পরিচিতি পেয়েছে “কায়দার কায়দা” নামে। লাল বাক্সের সামনের দিকে দুই পাশে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ প্রতিটি মুখেই লেন্স লাগানো। আর বাক্সের ভেতর কাপড়ে লাগানো থাকে ছবি। কাপড়টা পেঁচানো থাকে পাশের দুটি কাঠিতে। কাঠির ওপরের মাথায় বাক্সের বাইরে লাগানো থাকে একটা হ্যান্ডেল। এই হ্যান্ডেল ঘোরালে ছবিসহ কাপড়টা একপাশ থেকে গিয়ে আরেক পাশে পেঁচাতে থাকে। এ ভাবেই দিন কেটে যায় সর্বানন্দ মধুর।