রংপুরে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ সদস্যের নামে মামলা যা সম্পূর্ণ বানোয়াট
- Update Time : ০৩:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২০ Time View

রংপুরে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ সদস্যের নাম মামলা যা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন । চলতি মাসের ৫ তারিখে একটি সংবাদ প্রকাশ করা যেখানে পুলিশ সদস্য আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।কিন্তু আসল ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা এবং সত্য ঘটনাটি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
কুড়িগ্রামের কচাকাটা থানার পুলিশ সদস্য মো. আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি, মারধর এবং জোরপূর্বক বিষপান করিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাদী মোছাঃ হালিমা খাতুন, যিনি আশরাফুল আলমের সাবেক স্ত্রী, মামলায় উল্লেখ করেছেন—গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ রাতে তাকে যৌতুকের জন্য মারধর এবং ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে বিষপান করিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
তবে বিবাদী আশরাফুল আলমের দাবি, মামলায় উল্লিখিত ঘটনার আট দিন আগেই ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তালাক-সংক্রান্ত নথি সম্পন্ন হয়েছিল। একইসঙ্গে ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না; সরকারি দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জে ডিউটিতে ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনায় ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের একটি তালাক নোটিশ পাওয়া গেছে। ওই নথিতে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারার উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষরসহ তালাক-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে, হালিমা খাতুনের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পুনরায় পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। এতে তিনি রাজি না হওয়ায় তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে তাকে মাটিতে ফেলে মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক বিষাক্ত ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন পুলিশ সদস্য আশরাফুল আলম। তার ভাষ্য, মামলায় যে তারিখ ও সময়ে ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ঘটনার দিন তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তার এ দাবির সমর্থনে ডিউটি রেজিস্টারের তথ্যও সামনে আনা হয়েছে। প্রাপ্ত ডিউটি রেজিস্টারে ওই সময়ের দায়িত্বে থাকা ফোর্সের তালিকায় আশরাফুল আলমের নাম রয়েছে।
অভিযোগ ও নথিতে ভিন্নতার দাবি
এদিকে, মামলার অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার, একই ঘটনার বিষয়ে করা অন্যান্য চিকিৎসকের নথি, চিকিৎসার সময় এবং আঘাতের ধরনসহ অন্যান্য আলামত তদন্তের আওতায় আনা হলে অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই করা সহজ হতে পারে।
হালিমা খাতুনের করা সিআর মামলার অভিযোগ এবং লিগ্যাল এইডে দেওয়া অভিযোগের মধ্যে ঘটনার বিবরণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। একই ঘটনার বিষয়ে করা দুই অভিযোগে যদি সময়, স্থান, ঘটনার ধরন কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে সেসব তথ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আশরাফুল আলমের অভিযোগ, তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তার দাবি, হালিমা খাতুনের পূর্বের স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে চলে আসেন। তবে আশরাফুল আলমের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়েছে। তার দাবি, হালিমা খাতুনের পূর্বের স্বামী অসুস্থ থাকা অবস্থায় তার সম্পত্তি, টাকা-পয়সা ও বসতবাড়ি নিজের নামে লিখে নেওয়ার পর তাকে অসুস্থ অবস্থায় রেখে বাবার বাড়িতে চলে যান। এ বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়েছে।

আশরাফুল আলমের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, হালিমা খাতুনের এর আগে একাধিক বিয়ে হয়েছিল এবং বিয়ের পর স্বামীকে ফাঁসিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি বা প্রমাণ রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি বর্তমানে আশরাফুলের পক্ষের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনার দিনের কল রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন
মামলায় বর্ণিত ঘটনার দিন হালিমা খাতুনের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আশরাফুলের পক্ষ। তাদের দাবি, ৩০ এপ্রিলের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করা হলে ওই সময় হালিমা খাতুন কোথায় ছিলেন এবং কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরের সংরক্ষিত কল ডিটেইল রেকর্ড, প্রয়োজন হলে লোকেশন-সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য, হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার, চিকিৎসকের নথি, চিকিৎসার সময় এবং আঘাতের ধরনসহ অন্যান্য আলামত তদন্তের আওতায় আনা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সহজ হতে পারে।
আট দিনের ব্যবধানেই মূল প্রশ্ন
তালাকের নথির তারিখ এবং মামলায় বর্ণিত ঘটনার তারিখের ব্যবধানও এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল তালাক-সংক্রান্ত নথি সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ এপ্রিল নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই ঘটনার মধ্যে ব্যবধান মাত্র আট দিন।
আশরাফুল আলমের অভিযোগ, তালাকের নথি এবং ঘটনার দিন তার সরকারি দায়িত্বে থাকার তথ্য বিবেচনায় না নিয়েই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাকে হয়রানি ও ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই মামলাটি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের সংশ্লিষ্ট টেলিকম কর্মকর্তা ও টেলিকমের ওসি সফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। একইভাবে আশরাফুল আলমের নাম থাকা কিংবা কল রেকর্ডের কোনো তথ্য এককভাবে মামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করে না। এসব নথির সত্যতা, সময়ের সামঞ্জস্য এবং ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তথ্যগুলোর মিল রয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী হালিমা খাতুনের বক্তব্য এবং অভিযুক্ত আশরাফুল আলমের বক্তব্য—দুই পক্ষের তথ্যই গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে মামলার অভিযোগ, লিগ্যাল এইডের অভিযোগ, সিআর মামলার বক্তব্য, তালাকের নথি, ডিউটি রেজিস্টার, হাসপাতালের চিকিৎসা নথি এবং ঘটনার দিনের কল রেকর্ড পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে।
আশরাফুল আলমের পক্ষ থেকে মামলাটিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হলেও আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে হালিমা খাতুনের করা অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এ ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসতে পারে।





















