ঢাকা ১১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বদ্ধ কক্ষে গ্যাসের চুলা, সরু সিঁড়ি বটতলা হোটেলে অগ্নিঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৮:৪৪:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৫ Time View
Print

যশোর শহরের ব্যস্ততম দড়াটানা এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ডে পরিচালিত হচ্ছে বটতলা হোটেল। ভবনের নিচতলার বদ্ধ কক্ষে ক্রেতাদের বসার ব্যবস্থা। একই স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসের চুলায় চলছে রান্না। হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও সরু। ফলে কোনো কারণে আগুন লাগলে মুহূর্তেই বদ্ধ কক্ষে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়া এবং ক্রেতা-কর্মচারীদের নিরাপদে বের হতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে হোটেলটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর অগ্নিঝুঁকি।

শুধু আন্ডারগ্রাউন্ডের ভেতরেই নয়, হোটেলের সামনের ব্যস্ত সড়কের পাশের জায়গা দখল করেও চুলা জ্বালিয়ে রান্না করা হচ্ছে। ফলে একদিকে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে জনবহুল সড়কের পাশে খোলা আগুন ও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে বাড়ছে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি।

সরেজমিনে দেখা যায়, দড়াটানার ব্যস্ততম এলাকায় একটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড অংশে বটতলা হোটেলের কার্যক্রম চলছে। নিচতলার বদ্ধ কক্ষেই ক্রেতাদের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। কক্ষটিতে স্বাভাবিকভাবে আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে।

হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য যে সিঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও তুলনামূলক সরু। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে একসঙ্গে বহু মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করলে ওই সরু সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আগুনের সঙ্গে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুনের ঘটনায় প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষ, সরু বের হওয়ার পথ এবং গ্যাস সিলিন্ডারের উপস্থিতি থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের স্থাপনায় পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি বড় আকার ধারণ করতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হোটেলের সামনের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র। ব্যস্ত সড়কের পাশের জায়গা ব্যবহার করে চুলা জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করা হচ্ছে। পথচারী ও যানবাহনের চলাচলের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার ও খোলা আগুন ব্যবহার করায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার দাস ও শামিউল আলমের নেতৃত্বে হোটেলটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালানো হয়। অভিযানে রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ায় হোটেল মালিক আবুল কালামকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এরপরও হোটেলটির কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে।

হোটেলটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স বা অনুমোদন আছে কি না জানতে মালিক আবুল কালামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ছেলে জুয়েল হোসেন ফোনটি রিসিভ করেন। তিনি জানান, হোটেলটি নতুন করে চালু করা হয়েছে। এখনো ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়নি।

তিনি আরও জানান, আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হয় এবং যাতায়াতের সিঁড়িও ছোট। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, অধিকাংশ খাবারের হোটেল বা রেস্তোরাঁ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হলেও শুধু ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই সব ধরনের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হয় না। রেস্তোরাঁ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স নেওয়ার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অনুমোদন বা লাইসেন্সের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হয়। বটতলা হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দড়াটানার মতো জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে খাবারের হোটেল পরিচালনার বিষয়টি তাই নতুন করে সামনে এনেছে অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্ন। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ঘটার আগেই হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

বদ্ধ কক্ষে গ্যাসের চুলা, সরু সিঁড়ি বটতলা হোটেলে অগ্নিঝুঁকি

Update Time : ০৮:৪৪:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

যশোর শহরের ব্যস্ততম দড়াটানা এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ডে পরিচালিত হচ্ছে বটতলা হোটেল। ভবনের নিচতলার বদ্ধ কক্ষে ক্রেতাদের বসার ব্যবস্থা। একই স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসের চুলায় চলছে রান্না। হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও সরু। ফলে কোনো কারণে আগুন লাগলে মুহূর্তেই বদ্ধ কক্ষে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়া এবং ক্রেতা-কর্মচারীদের নিরাপদে বের হতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে হোটেলটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর অগ্নিঝুঁকি।

শুধু আন্ডারগ্রাউন্ডের ভেতরেই নয়, হোটেলের সামনের ব্যস্ত সড়কের পাশের জায়গা দখল করেও চুলা জ্বালিয়ে রান্না করা হচ্ছে। ফলে একদিকে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে জনবহুল সড়কের পাশে খোলা আগুন ও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে বাড়ছে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি।

সরেজমিনে দেখা যায়, দড়াটানার ব্যস্ততম এলাকায় একটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড অংশে বটতলা হোটেলের কার্যক্রম চলছে। নিচতলার বদ্ধ কক্ষেই ক্রেতাদের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। কক্ষটিতে স্বাভাবিকভাবে আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে।

হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য যে সিঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও তুলনামূলক সরু। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে একসঙ্গে বহু মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করলে ওই সরু সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আগুনের সঙ্গে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুনের ঘটনায় প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষ, সরু বের হওয়ার পথ এবং গ্যাস সিলিন্ডারের উপস্থিতি থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের স্থাপনায় পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি বড় আকার ধারণ করতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হোটেলের সামনের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র। ব্যস্ত সড়কের পাশের জায়গা ব্যবহার করে চুলা জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করা হচ্ছে। পথচারী ও যানবাহনের চলাচলের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার ও খোলা আগুন ব্যবহার করায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার দাস ও শামিউল আলমের নেতৃত্বে হোটেলটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালানো হয়। অভিযানে রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ায় হোটেল মালিক আবুল কালামকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এরপরও হোটেলটির কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে।

হোটেলটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স বা অনুমোদন আছে কি না জানতে মালিক আবুল কালামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ছেলে জুয়েল হোসেন ফোনটি রিসিভ করেন। তিনি জানান, হোটেলটি নতুন করে চালু করা হয়েছে। এখনো ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়নি।

তিনি আরও জানান, আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হয় এবং যাতায়াতের সিঁড়িও ছোট। অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, অধিকাংশ খাবারের হোটেল বা রেস্তোরাঁ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হলেও শুধু ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই সব ধরনের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হয় না। রেস্তোরাঁ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স নেওয়ার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অনুমোদন বা লাইসেন্সের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হয়। বটতলা হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দড়াটানার মতো জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ডের বদ্ধ কক্ষে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে খাবারের হোটেল পরিচালনার বিষয়টি তাই নতুন করে সামনে এনেছে অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্ন। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ঘটার আগেই হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।