কোজাগরী পূর্ণিমায় বাঙালি হিন্দু পরিবারে বিশেষ পূজার আয়োজন
- Update Time : ০৪:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৩ Time View

ধন-সম্পদ, শস্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দেবী মা লক্ষ্মী; কোজাগরী পূর্ণিমায় বাঙালি হিন্দু পরিবারে বিশেষ পূজার আয়োজন
প্রতিবেদন,মিলন বৈদ্য(শুভ):সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেবী লক্ষ্মীকে ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য, শস্য, প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে পূজা করা হয়। সংসারে সুখ-শান্তি, পরিবারের মঙ্গল, জীবিকার উন্নতি, ফসলের প্রাচুর্য এবং আর্থিক সচ্ছলতা কামনায় ভক্তরা ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবীর পূজা-অর্চনা করেন।
বাংলার ঘরে ঘরে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। এ পূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, আলপনা আঁকা, প্রদীপ প্রজ্বালন, ধান-দুর্বা, ফুল, ফল, মিষ্টি ও নৈবেদ্য নিবেদন এবং লক্ষ্মীপাঁচালি পাঠের মধ্য দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবী লক্ষ্মী হলেন ধন-সম্পদ, সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য, শস্য ও সমৃদ্ধির দেবী। তিনি ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী হিসেবে পরিচিত। দেবীর আরেক নাম ‘শ্রী’। তাঁর আরাধনার মাধ্যমে ভক্তরা জীবনে প্রাচুর্য, পারিবারিক কল্যাণ, কর্মে সাফল্য ও মানসিক শান্তি কামনা করেন।
দেবী লক্ষ্মীর প্রতীকী রূপেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। সাধারণত তাঁকে পদ্মের ওপর উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। পদ্ম পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও নির্মলতার প্রতীক। দেবীর হাতে পদ্মফুল, তাঁর চারপাশে পদ্মের উপস্থিতি এবং অনেক প্রতিমায় স্বর্ণমুদ্রা বর্ষণের দৃশ্য ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলার কৃষিনির্ভর ঐতিহ্যে দেবী লক্ষ্মীকে ধান-শস্য ও গোলাভরা ফসলের আশীর্বাদের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
সনাতন ধর্মের বিভিন্ন পুরাণে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাব সম্পর্কে নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে সমুদ্র মন্থনের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, একসময় ঋষি দুর্বাসার অভিশাপে দেবরাজ ইন্দ্রসহ দেবতাদের ঐশ্বর্য, জৌলুস ও সমৃদ্ধি হ্রাস পায়। অসুরদের শক্তি বৃদ্ধি পেলে দেবতারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শে দেবতা ও অসুরেরা অমৃত লাভের আশায় ক্ষীরসাগর মন্থন শুরু করেন।
মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং বাসুকি নাগকে রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করে সমুদ্র মন্থন করা হয়। এই মন্থন থেকে একে একে বিভিন্ন মূল্যবান রত্ন ও ঐশ্বরিক উপাদান আবির্ভূত হতে থাকে। একপর্যায়ে অপরূপ সৌন্দর্য ও দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে দেবী লক্ষ্মী পদ্মফুলের ওপর উপবিষ্ট অবস্থায় সমুদ্র থেকে আবির্ভূত হন।
দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবে দেবতারা আনন্দিত হন। দেবী পরম শ্রদ্ধা ও স্বেচ্ছায় ভগবান বিষ্ণুকে স্বামী হিসেবে বরণ করেন। এরপর থেকে দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান বিষ্ণুকে একসঙ্গে পূজা করার ঐতিহ্য সনাতন ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। এই কাহিনিতে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবকে হারানো ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ কথার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ—‘কে জেগে আছ?’ প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে বিচরণ করেন এবং যাঁরা জেগে থেকে ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করেন, তাঁদের আশীর্বাদ করেন।
এই বিশ্বাস থেকেই কোজাগরী পূর্ণিমায় রাতে লক্ষ্মীপূজা ও জাগরণের রীতি প্রচলিত হয়েছে। তবে এটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ; বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবারে পূজার নিয়মে পার্থক্য দেখা যায়।
বাংলার ঐতিহ্যে এই পূজা শুধু অর্থসম্পদ লাভের কামনায় সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের গোলায় ধান, পরিবারের মুখে অন্ন, মানুষের জীবিকায় সচ্ছলতা, সংসারে শান্তি এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও লক্ষ্মী আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথি শারদ পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমীর পর এই পূর্ণিমায় বহু পরিবারে বিশেষভাবে লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করা হয়।
এ ছাড়া অনেক পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার, দীপাবলির সময় এবং আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী বছরের অন্যান্য নির্দিষ্ট দিনেও দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। পূজার সঠিক দিন ও সময় নির্ধারণে স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করা উচিত।
২০২৬ সালের কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার ক্ষেত্রে প্রকাশিত পঞ্জিকাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর, রবিবার, পূর্ণিমা তিথিতে পূজা পালনের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ণিমা তিথি ২৬ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত থাকবে। স্থানভেদে পঞ্জিকার গণনায় কিছু পার্থক্য হতে পারে।
লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে ভক্তরা বাড়িঘর পরিষ্কার করে পবিত্র পরিবেশ তৈরি করেন। পূজার স্থান সাজানো হয় আলপনা, পদ্মফুল, ধান, প্রদীপ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে। অনেক বাড়িতে দরজার সামনে দেবী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয়, যা দেবীর শুভ আগমন ও গৃহে সমৃদ্ধির প্রতীক।
পূজায় সাধারণত ফুল, ফল, মিষ্টি, নারকেল, ধান, আতপ চাল এবং অন্যান্য নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। অনেক পরিবারে লক্ষ্মীপাঁচালি পাঠ, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণামের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন করা হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্মীর প্রতিমা, মাটির সরা, ঘট কিংবা প্রচলিত পারিবারিক রীতিতে দেবীর আরাধনা করা হয়।
দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা মানুষের জীবনে শুধু ধনসম্পদের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং শুদ্ধতা, পরিশ্রম, সততা, শৃঙ্খলা, কৃতজ্ঞতা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে সমৃদ্ধি কামনার পাশাপাশি সম্পদের সৎ ব্যবহার, অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পরিবারে শান্তি বজায় রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্মীপূজার মধ্য দিয়ে ভক্তরা প্রার্থনা করেন—সবার ঘরে অন্ন থাকুক, কর্মজীবনে সাফল্য আসুক, কৃষকের গোলা শস্যে ভরে উঠুক এবং সমাজ থেকে দারিদ্র্য, হিংসা ও অশান্তি দূর হোক।
দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার মূল বার্তা হলো—সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির কামনার পাশাপাশি সৎকর্ম, পরিশ্রম, মানবিকতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সুন্দর জীবন ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলা।




















