ঢাকা ০৪:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাইবার আইন সংশোধনে ভারসাম্যই হোক মূল কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : ০৮:৪৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৬ Time View
Print

আনোয়ার,চট্রগ্রাম:সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি, সাইবার হামলা, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদ প্রকাশের অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ফলে প্রস্তাবিত সাইবার আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
বর্তমান খসড়া নিয়ে উদ্বেগের মূল জায়গা এর কয়েকটি সংজ্ঞা ও ক্ষমতার পরিধি। প্রকাশিত খসড়ার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ প্রকাশ ও প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় এমন অসমর্থিত বা যাচাইহীন তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
এখানেই মূল প্রশ্ন। ‘ভুল তথ্য’, ‘অযাচাইকৃত তথ্য’ এবং ‘ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য’ কি একই বিষয়? নিশ্চয়ই নয়। একজন সাংবাদিক যথাসাধ্য তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর কোনো তথ্য ভুল প্রমাণিত হতে পারে। অন্যদিকে কেউ জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেন। দুটিকে একই আইনি কাঠামোয় দেখলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষত জনস্বার্থের সংবাদে সব তথ্য প্রকাশের মুহূর্তে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সবসময় সম্ভব নয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য যুক্ত হয়, আগের তথ্য সংশোধিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পরে পাওয়া যেতে পারে। তাই আইনে ইচ্ছাকৃত প্রতারণা এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকতার নামে মিথ্যা বা ক্ষতিকর তথ্য ছড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত অপতথ্য, সাইবার প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি কিংবা ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা এবং চরিত্রহনন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গালিগালাজ এক বিষয় নয় এবং প্রস্তাবিত আইন সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।
সরকারের বক্তব্যও তাই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমন করা নয়। তিনি জানিয়েছেন, খসড়াটি পর্যালোচনার সময় অস্পষ্ট বা অপব্যবহারযোগ্য শব্দ বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি আইনের ক্ষেত্রে শুধু উদ্দেশ্য নয়, আইনের ভাষা এবং প্রয়োগের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো উদ্দেশ্যের আইনও যদি অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও অতিরিক্ত ক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়, ভবিষ্যতে তার অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার কারণ তৈরি করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার ইতিহাস এবং আইনটির অপপ্রয়োগ নিয়ে দেশ-বিদেশে দীর্ঘদিন সমালোচনা হয়েছে। CPJ-এর হিসাবে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ওই আইনের অধীনে অন্তত ২৫৫ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়। নতুন আইনের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধান রাখা উচিত নয়, যা বৈধ সাংবাদিকতা, সরকারের সমালোচনা, জনস্বার্থের অনুসন্ধান কিংবা ভিন্নমত প্রকাশকে অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কনটেন্ট ব্লক এবং সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্সের প্রশ্ন। প্রকাশিত খসড়ায় কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানো এবং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের সুযোগের কথা এসেছে।
এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া ও বিচারিক পর্যালোচনা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রতিবেদন নিয়ে বিরোধ হলে সংশোধন, জবাব প্রকাশ, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আদালতের আশ্রয়ের সুযোগ থাকা স্বাভাবিক। সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক স্বাধীনতার ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণেই অংশীজনের মতামত গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ সেপ্টেম্বর সরকারের উদ্যোগে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে খসড়া নিয়ে পরামর্শ হয়েছে এবং সরকার জানিয়েছে, খসড়াটি চূড়ান্ত নয়। এই পরামর্শ প্রক্রিয়া যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক, আইনজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মতামত বাস্তবিক অর্থে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিক সমাজেরও আত্মজবাবদিহি প্রয়োজন। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, ভুল হলে দ্রুত সংশোধন এবং ব্যক্তিগত অধিকার ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা—এসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। স্বাধীনতার দাবি যত গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দায়িত্বও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে Transparency International Bangladesh-ও সতর্ক করেছে যে সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে একটি আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে মৌলিক অধিকারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ ও ‘ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য’-এর পৃথক সংজ্ঞা; জনস্বার্থে সাংবাদিকতার সুরক্ষা; অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যথাযথ প্রতিকার; কনটেন্ট ব্লকের ক্ষেত্রে স্বাধীন পর্যালোচনা; এবং সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষেত্রে কার্যকর বিচারিক সুরক্ষা।
সবশেষে, সাইবার নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর জনসম্মুখে প্রশ্ন তোলার সুযোগও প্রয়োজন। একটি ভালো সাইবার আইন সেই ভারসাম্যই নিশ্চিত করবে।
আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা, বৈধ সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করা নয়। আবার সাংবাদিকতার স্বাধীনতার আড়ালে প্রকৃত সাইবার অপরাধের সুযোগও থাকা উচিত নয়। খসড়া চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনের মতামত, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হলে একটি অধিক স্পষ্ট, কার্যকর ও অধিকারসম্মত আইন প্রণয়ন সম্ভব হতে পারে।
সাইবার অপরাধ দমনে আইন চাই, তবে সেই আইন যেন অপরাধের বিরুদ্ধে ঢাল হয়—স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর শিকল নয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

সাইবার আইন সংশোধনে ভারসাম্যই হোক মূল কথা

Update Time : ০৮:৪৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

আনোয়ার,চট্রগ্রাম:সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি, সাইবার হামলা, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদ প্রকাশের অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ফলে প্রস্তাবিত সাইবার আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
বর্তমান খসড়া নিয়ে উদ্বেগের মূল জায়গা এর কয়েকটি সংজ্ঞা ও ক্ষমতার পরিধি। প্রকাশিত খসড়ার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ প্রকাশ ও প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় এমন অসমর্থিত বা যাচাইহীন তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
এখানেই মূল প্রশ্ন। ‘ভুল তথ্য’, ‘অযাচাইকৃত তথ্য’ এবং ‘ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য’ কি একই বিষয়? নিশ্চয়ই নয়। একজন সাংবাদিক যথাসাধ্য তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর কোনো তথ্য ভুল প্রমাণিত হতে পারে। অন্যদিকে কেউ জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেন। দুটিকে একই আইনি কাঠামোয় দেখলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষত জনস্বার্থের সংবাদে সব তথ্য প্রকাশের মুহূর্তে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সবসময় সম্ভব নয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য যুক্ত হয়, আগের তথ্য সংশোধিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পরে পাওয়া যেতে পারে। তাই আইনে ইচ্ছাকৃত প্রতারণা এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকতার নামে মিথ্যা বা ক্ষতিকর তথ্য ছড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত অপতথ্য, সাইবার প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি কিংবা ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা এবং চরিত্রহনন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গালিগালাজ এক বিষয় নয় এবং প্রস্তাবিত আইন সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।
সরকারের বক্তব্যও তাই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমন করা নয়। তিনি জানিয়েছেন, খসড়াটি পর্যালোচনার সময় অস্পষ্ট বা অপব্যবহারযোগ্য শব্দ বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি আইনের ক্ষেত্রে শুধু উদ্দেশ্য নয়, আইনের ভাষা এবং প্রয়োগের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো উদ্দেশ্যের আইনও যদি অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও অতিরিক্ত ক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়, ভবিষ্যতে তার অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার কারণ তৈরি করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার ইতিহাস এবং আইনটির অপপ্রয়োগ নিয়ে দেশ-বিদেশে দীর্ঘদিন সমালোচনা হয়েছে। CPJ-এর হিসাবে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ওই আইনের অধীনে অন্তত ২৫৫ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়। নতুন আইনের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধান রাখা উচিত নয়, যা বৈধ সাংবাদিকতা, সরকারের সমালোচনা, জনস্বার্থের অনুসন্ধান কিংবা ভিন্নমত প্রকাশকে অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কনটেন্ট ব্লক এবং সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্সের প্রশ্ন। প্রকাশিত খসড়ায় কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানো এবং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের সুযোগের কথা এসেছে।
এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া ও বিচারিক পর্যালোচনা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রতিবেদন নিয়ে বিরোধ হলে সংশোধন, জবাব প্রকাশ, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আদালতের আশ্রয়ের সুযোগ থাকা স্বাভাবিক। সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক স্বাধীনতার ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণেই অংশীজনের মতামত গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ সেপ্টেম্বর সরকারের উদ্যোগে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে খসড়া নিয়ে পরামর্শ হয়েছে এবং সরকার জানিয়েছে, খসড়াটি চূড়ান্ত নয়। এই পরামর্শ প্রক্রিয়া যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক, আইনজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মতামত বাস্তবিক অর্থে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিক সমাজেরও আত্মজবাবদিহি প্রয়োজন। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, ভুল হলে দ্রুত সংশোধন এবং ব্যক্তিগত অধিকার ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা—এসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। স্বাধীনতার দাবি যত গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দায়িত্বও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে Transparency International Bangladesh-ও সতর্ক করেছে যে সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে একটি আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে মৌলিক অধিকারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ ও ‘ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য’-এর পৃথক সংজ্ঞা; জনস্বার্থে সাংবাদিকতার সুরক্ষা; অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যথাযথ প্রতিকার; কনটেন্ট ব্লকের ক্ষেত্রে স্বাধীন পর্যালোচনা; এবং সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষেত্রে কার্যকর বিচারিক সুরক্ষা।
সবশেষে, সাইবার নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর জনসম্মুখে প্রশ্ন তোলার সুযোগও প্রয়োজন। একটি ভালো সাইবার আইন সেই ভারসাম্যই নিশ্চিত করবে।
আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা, বৈধ সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করা নয়। আবার সাংবাদিকতার স্বাধীনতার আড়ালে প্রকৃত সাইবার অপরাধের সুযোগও থাকা উচিত নয়। খসড়া চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনের মতামত, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হলে একটি অধিক স্পষ্ট, কার্যকর ও অধিকারসম্মত আইন প্রণয়ন সম্ভব হতে পারে।
সাইবার অপরাধ দমনে আইন চাই, তবে সেই আইন যেন অপরাধের বিরুদ্ধে ঢাল হয়—স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর শিকল নয়।