ঢাকা ০৭:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধর্ষণ মামলার আসামি পলাতক: সাংবাদিকদের নামে ‘প্রতিশোধমূলক’ মামলা, গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ

নিজেস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৯:০৪:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৬৭ Time View
Print

এমদাদুল হক,ক্রাইম রিপোর্টার মনিরামপুরঃ

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে দায়ের করা ধর্ষণ মামলার এক মাস অতিবাহিত হলেও তাকে গ্রেফতার করতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে পলাতক থাকা সত্ত্বেও গ্রেফতার না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মণিরামপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও তিনি এখনো পলাতক। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় এটি ‘আইনের শৈথিল্য’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এরই মধ্যে পলাতক অবস্থায় থেকেই ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশকারী ১০ সাংবাদিকের নামে মামলা দায়েরের ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি ‘প্রতিশোধমূলক’ ও ‘ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল’, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন একে সরাসরি ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রুত গ্রেফতার না হলে দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ মার্চ ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী সামিয়া আফরোজ নিজেই বাদী হয়ে তার দুলাভাই ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় এ ধরনের অপরাধ অতি গুরুতর এবং অজামিনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। ফলে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধ্যবাধকতা বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযুক্ত রাফসান জানি ৪৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন। তিনি যশোর সদর উপজেলার ঘুরুলিয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী তরুণী লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা এবং রংপুরের একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। ২০২০ সালের শেষ দিকে বোনের দেখভালের জন্য যশোরে নিয়ে আসার পর থেকে অভিযুক্ত বিভিন্নভাবে তাকে কুপ্রস্তাব দিতে থাকেন। একপর্যায়ে বাসায় একা পেয়ে তাকে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ এবং আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণের অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং ধারণকৃত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। বিষয়টি দণ্ডবিধির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায়ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ভুক্তভোগীকে পুলিশ শেল্টার হোমে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীর দেওয়া ছবি-ভিডিও, অভিযোগপত্র, পারিবারিক জবানবন্দি ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমদ ফয়সাল জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। চাকরির বিধি অনুযায়ী, এটি শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে তার পলাতক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।

মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি জাকির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, নির্যাতিতাকে সহায়তা করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে অভিযুক্তকে গ্রেফতার এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করায় ডিবিসি নিউজ ও ডেইলি অবজারভারের যশোর জেলা প্রতিনিধি সাকিকুল কবীর রিটন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকার মানহানির মামলা করেছেন।

দুইটি মামলার আসামি এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় যশোর, মণিরামপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ধর্ষণ মামলার আসামি পলাতক: সাংবাদিকদের নামে ‘প্রতিশোধমূলক’ মামলা, গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ

Update Time : ০৯:০৪:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
Print

এমদাদুল হক,ক্রাইম রিপোর্টার মনিরামপুরঃ

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে দায়ের করা ধর্ষণ মামলার এক মাস অতিবাহিত হলেও তাকে গ্রেফতার করতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে পলাতক থাকা সত্ত্বেও গ্রেফতার না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মণিরামপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও তিনি এখনো পলাতক। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় এটি ‘আইনের শৈথিল্য’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এরই মধ্যে পলাতক অবস্থায় থেকেই ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশকারী ১০ সাংবাদিকের নামে মামলা দায়েরের ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি ‘প্রতিশোধমূলক’ ও ‘ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল’, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন একে সরাসরি ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রুত গ্রেফতার না হলে দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ মার্চ ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী সামিয়া আফরোজ নিজেই বাদী হয়ে তার দুলাভাই ডা. রাফসান জানির বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় এ ধরনের অপরাধ অতি গুরুতর এবং অজামিনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। ফলে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধ্যবাধকতা বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযুক্ত রাফসান জানি ৪৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন। তিনি যশোর সদর উপজেলার ঘুরুলিয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী তরুণী লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা এবং রংপুরের একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। ২০২০ সালের শেষ দিকে বোনের দেখভালের জন্য যশোরে নিয়ে আসার পর থেকে অভিযুক্ত বিভিন্নভাবে তাকে কুপ্রস্তাব দিতে থাকেন। একপর্যায়ে বাসায় একা পেয়ে তাকে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ এবং আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণের অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং ধারণকৃত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। বিষয়টি দণ্ডবিধির পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায়ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপত্তাজনিত কারণে ভুক্তভোগীকে পুলিশ শেল্টার হোমে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীর দেওয়া ছবি-ভিডিও, অভিযোগপত্র, পারিবারিক জবানবন্দি ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমদ ফয়সাল জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। চাকরির বিধি অনুযায়ী, এটি শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে তার পলাতক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।

মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি জাকির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, নির্যাতিতাকে সহায়তা করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে অভিযুক্তকে গ্রেফতার এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করায় ডিবিসি নিউজ ও ডেইলি অবজারভারের যশোর জেলা প্রতিনিধি সাকিকুল কবীর রিটন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকার মানহানির মামলা করেছেন।

দুইটি মামলার আসামি এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় যশোর, মণিরামপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানিয়েছেন।