ঢাকা ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল আসক্তিতে অন্ধকারে শিক্ষা: লাউচাপড়া স্কুলে ৪২ জনের মধ্যে পাস মাত্র ৩, ক্লাসরুম নিশ্চুপ।

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৫৯:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৪ Time View
Print

মোহাম্মদ শিহাব মাহমুদ জামালপুর জেলা প্রতিনিধি:-

যে বয়সে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা আর হৃদয়ে জানার আগ্রহ, সেই বয়সে তাদের মনোযোগ বন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ ইঞ্চির স্মার্টফোন পর্দায়। জামালপুরের বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ এখন খাদের কিনারায়। শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের সেই উদ্দীপনা নেই; চারদেয়ালের মাঝে চেপে বসেছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। পড়াশোনা বাদ দিয়ে মোবাইল ফোনে ‘টিকটক’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সর্বনাশা আসক্তি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিচ্ছে ঘোর অন্ধকারে।

যার নির্মম প্রতিফলন ঘটেছে এবারের এসএসসি (SSC) পরীক্ষার ফলাফলে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৪২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাসের মুখ দেখেছে মাত্র ৩ জন অর্থাৎ ৩৯ জন শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে, যা ওই এলাকার শিক্ষা ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ধস।

এ যেন শুধু একটি স্কুলের বিপর্যয় নয়, বরং গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত থাবার এক করুণ প্রতীক।

খাতা-কলমের বদলে ‘কনটেন্ট’ তৈরির প্রতিযোগিতা

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্কুলে আসা অনেক শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য এখন পড়াশোনা নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা প্রাঙ্গণে নানারকম ট্রেন্ডিং ভিডিও ও রিলস বানাতে ব্যস্ত থাকে তারা। ফলে পড়ার টেবিলে যে মনোযোগ থাকার কথা, তা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে নোটিফিকেশনের শব্দে। শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের তদারকির অভাবে স্কুলের সেই চিরচেনা শৃঙ্খলা আর ভাবগাম্ভীর্য হারিয়ে গেছে।

ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মহল জানান:

ফলাফলের এই নজিরবিহীন বিপর্যয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশায় ফুসছেন অভিভাবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই মানুষের মতো মানুষ হতে। ৪২ জন পরীক্ষা দিয়ে যদি ৩৯ জনই ফেল করে, তবে শিক্ষকরা স্কুলে গিয়ে কী পড়ালেন? আর শিক্ষার্থীরাই বা স্কুলে এসে কী করল? পড়াশোনা ছেড়ে টিকটক আর ফোনে বুঁদ হয়ে থাকার কারণেই এই লজ্জা।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তিকে শিক্ষার কাজে না লাগিয়ে বিনোদনের অতি-ব্যবহারেই এই ডিজিটাল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও অভিভাবক উভয় পক্ষের উদাসীনতাই এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে।

সংকট উত্তরণে জরুরি সুপারিশ:

ডিজিটাল ফ্রি ক্যাম্পাস: বিদ্যালয় চলাকালীন শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন আনা ও ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
তদন্ত ও জবাবদিহিতা: ৪২ জনের মধ্যে ৩৯ জন ফেল করার কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ী শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
কাউন্সেলিং ও অভিভাবক সমাবেশ: শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি ছাড়াতে বিশেষ কাউন্সেলিং এবং অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করা।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এই বিদ্যালয়টির হারিয়ে যাওয়া সুনাম ফেরাতে এখনই স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছেন এলাকাবাসী।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ডিজিটাল আসক্তিতে অন্ধকারে শিক্ষা: লাউচাপড়া স্কুলে ৪২ জনের মধ্যে পাস মাত্র ৩, ক্লাসরুম নিশ্চুপ।

Update Time : ০৮:৫৯:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
Print

মোহাম্মদ শিহাব মাহমুদ জামালপুর জেলা প্রতিনিধি:-

যে বয়সে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা আর হৃদয়ে জানার আগ্রহ, সেই বয়সে তাদের মনোযোগ বন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ ইঞ্চির স্মার্টফোন পর্দায়। জামালপুরের বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ এখন খাদের কিনারায়। শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের সেই উদ্দীপনা নেই; চারদেয়ালের মাঝে চেপে বসেছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। পড়াশোনা বাদ দিয়ে মোবাইল ফোনে ‘টিকটক’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সর্বনাশা আসক্তি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিচ্ছে ঘোর অন্ধকারে।

যার নির্মম প্রতিফলন ঘটেছে এবারের এসএসসি (SSC) পরীক্ষার ফলাফলে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৪২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাসের মুখ দেখেছে মাত্র ৩ জন অর্থাৎ ৩৯ জন শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে, যা ওই এলাকার শিক্ষা ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ধস।

এ যেন শুধু একটি স্কুলের বিপর্যয় নয়, বরং গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত থাবার এক করুণ প্রতীক।

খাতা-কলমের বদলে ‘কনটেন্ট’ তৈরির প্রতিযোগিতা

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্কুলে আসা অনেক শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য এখন পড়াশোনা নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা প্রাঙ্গণে নানারকম ট্রেন্ডিং ভিডিও ও রিলস বানাতে ব্যস্ত থাকে তারা। ফলে পড়ার টেবিলে যে মনোযোগ থাকার কথা, তা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে নোটিফিকেশনের শব্দে। শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের তদারকির অভাবে স্কুলের সেই চিরচেনা শৃঙ্খলা আর ভাবগাম্ভীর্য হারিয়ে গেছে।

ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মহল জানান:

ফলাফলের এই নজিরবিহীন বিপর্যয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশায় ফুসছেন অভিভাবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই মানুষের মতো মানুষ হতে। ৪২ জন পরীক্ষা দিয়ে যদি ৩৯ জনই ফেল করে, তবে শিক্ষকরা স্কুলে গিয়ে কী পড়ালেন? আর শিক্ষার্থীরাই বা স্কুলে এসে কী করল? পড়াশোনা ছেড়ে টিকটক আর ফোনে বুঁদ হয়ে থাকার কারণেই এই লজ্জা।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তিকে শিক্ষার কাজে না লাগিয়ে বিনোদনের অতি-ব্যবহারেই এই ডিজিটাল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও অভিভাবক উভয় পক্ষের উদাসীনতাই এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে।

সংকট উত্তরণে জরুরি সুপারিশ:

ডিজিটাল ফ্রি ক্যাম্পাস: বিদ্যালয় চলাকালীন শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন আনা ও ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
তদন্ত ও জবাবদিহিতা: ৪২ জনের মধ্যে ৩৯ জন ফেল করার কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ী শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
কাউন্সেলিং ও অভিভাবক সমাবেশ: শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি ছাড়াতে বিশেষ কাউন্সেলিং এবং অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করা।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এই বিদ্যালয়টির হারিয়ে যাওয়া সুনাম ফেরাতে এখনই স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছেন এলাকাবাসী।