এক আগুন নেভার আগেই আরেক প্রান্তে ধোঁয়া: ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার তিন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড
- Update Time : ১১:৩৫:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১১ Time View

আবু তালেব বিশেষ প্রতিনিধি
উত্তরার সেন্টার পয়েন্ট, ধানমন্ডি ২৭-এর এপেক্স ভবনের পর মহাখালীতে আগুন—অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
একদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা, অন্যদিকে রাজধানীর আরেক প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে ধোঁয়ার খবর। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকার তিন ব্যস্ত এলাকায় পৃথক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
উত্তরার সেন্টার পয়েন্ট শপিং মলের রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের এপেক্স ভবনের শোরুম, এরপর মহাখালীতে ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান টোব্যাকোর ভবনের পাশে একটি ভবনের ছাদে জমে থাকা পরিত্যক্ত প্লাস্টিকে আগুন—ঘটনাস্থল আলাদা হলেও তিনটি ঘটনাই সামনে এনেছে রাজধানীর অগ্নিনিরাপত্তার পুরোনো প্রশ্ন।
তবে তিনটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও পরিস্থিতি এক নয়। তাই ঘটনাগুলোকে একই সূত্রে গেঁথে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে আগুন লাগার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রাজধানীর ভবনগুলো অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় আসলে কতটা প্রস্তুত?
প্রথম আগুন উত্তরায়
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের সেন্টার পয়েন্ট শপিং মলের ছয়তলা ভবনের পঞ্চম তলায় একটি রেস্টুরেন্টে আগুন লাগে।
দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে উত্তরা ও বিমানবন্দর ফায়ার স্টেশনের ছয়টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় ৩৫ মিনিটের চেষ্টায় দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কয়েক ঘণ্টা পর ধানমন্ডিতে আগুন
উত্তরার আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই রাজধানীর আরেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে আসে অগ্নিকাণ্ডের খবর।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫ মিনিটে এপেক্স ভবনের একটি শোরুমে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে আরও দুটি ইউনিট সেখানে যোগ দেয়।
দুপুর ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। আগুনের কারণও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এবার মহাখালী
ধানমন্ডির আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ১২ মিনিটে মহাখালী থেকে আসে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের খবর।
ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান টোব্যাকোর ভবনের পাশে চারতলা একটি ভবনের ছাদে জমে থাকা পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের মালামালে আগুন লাগে। ওই ভবনের তৃতীয় তলায় একটি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন রয়েছে বলেও জানা গেছে।
খবর পেয়ে তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও
রাজধানীর এক প্রান্তের আগুনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই অন্য প্রান্তে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের খবর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকায় কি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে?
তবে মাত্র তিনটি সাম্প্রতিক ঘটনার ভিত্তিতে এমন কোনো প্রবণতা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা।
আগুন লাগার পর প্রস্তুতি, নাকি আগেই প্রতিরোধ?
প্রতিটি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত সাড়া পাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস কত দ্রুত পৌঁছাবে, শুধু সেটিই কি আমাদের নিরাপত্তার শেষ ভরসা?
নাকি আগুন লাগার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা, দাহ্য পদার্থ নিরাপদে রাখা এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য?
রাজধানীর বাস্তবতা কঠিন। ঘনবসতি, যানজট, সরু সড়ক, বহুতল ভবন ও বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক স্থাপনার কারণে কোনো একটি ভবনে আগুন লাগলে তা দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আবার আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কয়েক মিনিটের বিলম্বও কখনো কখনো বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনটি আগুন কি শুধুই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
উত্তরার রেস্টুরেন্ট, ধানমন্ডির শোরুম কিংবা মহাখালীর ছাদে জমে থাকা প্লাস্টিক—ঘটনাগুলোর প্রকৃতি আলাদা। তাই এগুলোকে একই ধরনের অগ্নিকাণ্ড বলা যাবে না।
তবে তিনটি ঘটনাই একটি বিষয় সামনে এনেছে—রাজধানীর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
আগুন নেভানোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আগুন যাতে না লাগে, সেই ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন, বৈদ্যুতিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ, দাহ্য বস্তু অপসারণ, জরুরি বহির্গমন পথ খোলা রাখা এবং ভবন ব্যবহারকারীদের অগ্নিনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা—সবকিছুর ওপরই জোর দিতে হবে।
কারণ আগুন লাগার পর কয়েকটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসা স্বস্তির খবর হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে নিরাপদ পরিস্থিতি হলো—আগুন লাগার আগেই ঝুঁকিটা শনাক্ত হওয়া।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু—ঢাকার কোথায় কোথায় আগুন লাগছে?
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আগুন লাগার আগেই রাজধানী কতটা প্রস্তুত?
এই প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত খোঁজা যাবে, ততই কমবে বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি।
























