রাজধানীর ৪ হাজার কিমি সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী মাত্র ২৮০ কিমি
- Update Time : ০১:০৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৩ Time View

তালেব, বিশেষ প্রতিনিধি:রাজধানী ঢাকার প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে লেনভিত্তিক বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে।
বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) মাঠপর্যায়ের জরিপে রাজধানীর সড়কব্যবস্থার এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, মহানগরের সব সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। যেসব সড়কে পর্যাপ্ত জায়গা ও নির্দিষ্ট লেন রয়েছে, সেগুলোই বড় বাস চলাচলের জন্য উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য সড়কগুলোতে রিকশা, অটোরিকশাসহ তুলনামূলক ছোট যানবাহন চলাচল করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে বিশেষ করে রাজধানীর দক্ষিণ অংশের অনেক সড়ক বড় বাস চলাচলের উপযোগী করে গড়ে ওঠেনি। ফলে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাইলেও সড়কের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জরিপের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, রাজধানীর সচল ৯৮টি বাস রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রার উৎস ও গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়। পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত চিত্র ধারণ করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমানে সচল ৯৮টি বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি মূল রুট করার প্রস্তাব দিয়েছে ডিটিসিএ। প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশই বিদ্যমান বাস রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, লেনভিত্তিক জরিপে রাজধানীর প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত লেন ও সড়কের প্রস্থ না থাকায় বাকি সড়কগুলোকে বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
তিনি বলেন, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার মাধ্যমে রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন করা না গেলে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা একক বাসমালিকের পরিবর্তে সরাসরি কোম্পানির কাছে বাস পরিচালনার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার মাধ্যমে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে কয়েকটি রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ, ৫২ আসনের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর প্রস্তাবও করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় বাসের ফিটনেস, চালকদের শৃঙ্খলা এবং আইন ভঙ্গের দায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো বাস বা চালকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কার এবং বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবার মান ও চালকদের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে সংশ্লিষ্ট রুটের পারমিট বাতিল করে নতুন কোম্পানি নিয়োগ বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে রাজধানীর সব বাস মেরামত ও রং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট বাসের চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অবৈধ, জীর্ণ, রুট লঙ্ঘনকারী এবং পারমিটবিহীন বাস চলাচল বন্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও মালিক সমিতি রুট ও এলাকাভিত্তিক দল গঠন করবে। একই সঙ্গে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা নিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে সভা করার কথাও রয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ বলেন, গত দুই বছরে রাজধানীতে অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে সড়কের একটি বড় অংশ দখল করেছে। এর পাশাপাশি ভ্যান, ফুটপাত এবং দোকান-মার্কেটে মালামাল ওঠানামার কারণে সড়কের কার্যকর জায়গা আরও সংকুচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার বিষয়ে মালিক সমিতির আগ্রহ রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবহন খাতের অতিরিক্ত খরচ কমবে এবং বাসমালিকদের আয়ও সুরক্ষিত হবে।
তবে ২৮০ কিলোমিটার সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করার জরিপের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, হকার, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক এবং বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানের দখলের কারণে রাজধানীর অনেক সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে গেছে। এসব দখল ও প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিলে বাস চলাচলের উপযোগী সড়কের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার কারণে মহানগরের সব সড়ককে বড় বাস চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব নয়। শুধু দখল উচ্ছেদ করলেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজধানীর সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বাস, রিকশা, পথচারীসহ বিভিন্ন ধরনের যাতায়াতব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে সড়ক পরিকল্পনা করতে হবে।
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই বাস রুট রেশনালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে। তবে সড়কের সীমাবদ্ধতা, দখল, অব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপের মধ্যে প্রস্তাবিত ৩২টি মূল রুট কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।























