ঢাকা ০৭:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝিনাইদহে ৪০ কোটির সড়ক নির্মাণ: খোয়ার বদলে আস্ত ইট, চরম অনিয়ম!

Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৩৬:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৭ Time View
Print

রাসেল হোসেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-ঝিনাইদহ শহরকে যানজটমুক্ত ও রূপসৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাতে নেওয়া ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের মেগা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও ঘাপলাবাজীর অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে সাববেজ (ভিত্তিস্তর) তৈরির ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী উন্নতমানের খোয়া ব্যবহার না করে সরাসরি আস্ত ইট ও বালি ছাড়া শুধু মাটি বিছিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

রোববার (৪ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে এমন অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে সড়ক থেকে আস্ত ইট তুলে নিতে দেখা যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল থেকে আড়াপপুর হয়ে হামদাহ পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণে দুই প্যাকেজে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ ফুট সড়কটিকে ৩০ ফুটে উন্নীত করার অংশ হিসেবে ১৬ কোটি টাকায় ‘রিজিড পেভমেন্ট’ এবং ২৪ কোটি টাকায় ‘ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট’ নির্মাণের কথা। মূল কাজটি পেয়েছে ‘হাসান টেকনো’ ও ‘মাসুদ হাইটেক’ নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ঠিকাদার নিজে কাজ না করে বাবু পাটোয়ারী নামের এক সাব-ঠিকাদারের কাছে পুরো কাজটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান, ওলিয়ার রহমান ও সবুজ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুরুর দিন থেকেই এই মেগা প্রকল্পের কাজে চরম ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। সাববেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো বালি ব্যবহার করা হয়নি, মাটি আর নিম্নমানের আস্ত ইট দিয়ে রোলার করা হচ্ছে। সরকারি কোটি কোটি টাকার বাজেট হলেও এভাবে কাজ করা মানে স্রেফ জনগণের ট্যাক্সের টাকা পানিতে ফেলা।”

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের স্থানে তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) হাসান আল মামুনের সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও কাজের সাইটে তাঁর কোনো দেখা মেলেনি।

সংবাদ পেয়ে বিকেলেই দুর্ঘটনাস্থল ও কাজের সাইট পরিদর্শনে আসেন ঝিনাইদহ সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন। কাজের নিম্নমান ও ভেকু দিয়ে ইট তোলার দৃশ্য দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন বলেন, “যেভাবে কাজটি করা হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট গ্রেডের খোয়া না দিয়ে আস্ত ইট বিছিয়ে সড়ক প্রস্তুত করা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

ঘটনাস্থলে কাজের ধরণ দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন জানান, “এভাবে আস্ত ইট ও মাটি দিয়ে সড়ক নির্মাণ করার কোনো সরকারি বিধান নেই। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সাইট ভিজিট করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। নিয়মানুযায়ী সিডিউল মেনে নতুন করে সঠিক গ্রেডের খোয়া ও বালি দিয়ে সাববেজ প্রস্তুত না করা পর্যন্ত বিল ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে অনিয়মের বিষয়ে জানতে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসুদ হাইটেক বা হাসান টেকনোর কোনো প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। আর কাজের দায়িত্বে থাকা সাব-ঠিকাদার এসআর ইন্টারপ্রাইজের মালিক বাবু পাটোয়ারীর সাইট ম্যানেজার মাসুদ ও সুপারভাইজার লিটন জানান, আমরা সাইট বৃদ্ধি করতে এভাবে কাজ করছি। এটা সিডিউলে নেই। দায়বদ্ধতার দিক থেকে আপাতত এটা করছি। এটা স্থায়ী কাজ নয়। মুল কাজ শেষ হলে এটা তুলে নতুন করে করা হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ঝিনাইদহে ৪০ কোটির সড়ক নির্মাণ: খোয়ার বদলে আস্ত ইট, চরম অনিয়ম!

Update Time : ০৫:৩৬:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
Print

রাসেল হোসেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-ঝিনাইদহ শহরকে যানজটমুক্ত ও রূপসৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাতে নেওয়া ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের মেগা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও ঘাপলাবাজীর অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে সাববেজ (ভিত্তিস্তর) তৈরির ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী উন্নতমানের খোয়া ব্যবহার না করে সরাসরি আস্ত ইট ও বালি ছাড়া শুধু মাটি বিছিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

রোববার (৪ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে এমন অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে সড়ক থেকে আস্ত ইট তুলে নিতে দেখা যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল থেকে আড়াপপুর হয়ে হামদাহ পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণে দুই প্যাকেজে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ ফুট সড়কটিকে ৩০ ফুটে উন্নীত করার অংশ হিসেবে ১৬ কোটি টাকায় ‘রিজিড পেভমেন্ট’ এবং ২৪ কোটি টাকায় ‘ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট’ নির্মাণের কথা। মূল কাজটি পেয়েছে ‘হাসান টেকনো’ ও ‘মাসুদ হাইটেক’ নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ঠিকাদার নিজে কাজ না করে বাবু পাটোয়ারী নামের এক সাব-ঠিকাদারের কাছে পুরো কাজটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান, ওলিয়ার রহমান ও সবুজ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুরুর দিন থেকেই এই মেগা প্রকল্পের কাজে চরম ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। সাববেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো বালি ব্যবহার করা হয়নি, মাটি আর নিম্নমানের আস্ত ইট দিয়ে রোলার করা হচ্ছে। সরকারি কোটি কোটি টাকার বাজেট হলেও এভাবে কাজ করা মানে স্রেফ জনগণের ট্যাক্সের টাকা পানিতে ফেলা।”

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজের স্থানে তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) হাসান আল মামুনের সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও কাজের সাইটে তাঁর কোনো দেখা মেলেনি।

সংবাদ পেয়ে বিকেলেই দুর্ঘটনাস্থল ও কাজের সাইট পরিদর্শনে আসেন ঝিনাইদহ সওজের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন। কাজের নিম্নমান ও ভেকু দিয়ে ইট তোলার দৃশ্য দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন বলেন, “যেভাবে কাজটি করা হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট গ্রেডের খোয়া না দিয়ে আস্ত ইট বিছিয়ে সড়ক প্রস্তুত করা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

ঘটনাস্থলে কাজের ধরণ দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন জানান, “এভাবে আস্ত ইট ও মাটি দিয়ে সড়ক নির্মাণ করার কোনো সরকারি বিধান নেই। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সাইট ভিজিট করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। নিয়মানুযায়ী সিডিউল মেনে নতুন করে সঠিক গ্রেডের খোয়া ও বালি দিয়ে সাববেজ প্রস্তুত না করা পর্যন্ত বিল ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে অনিয়মের বিষয়ে জানতে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসুদ হাইটেক বা হাসান টেকনোর কোনো প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। আর কাজের দায়িত্বে থাকা সাব-ঠিকাদার এসআর ইন্টারপ্রাইজের মালিক বাবু পাটোয়ারীর সাইট ম্যানেজার মাসুদ ও সুপারভাইজার লিটন জানান, আমরা সাইট বৃদ্ধি করতে এভাবে কাজ করছি। এটা সিডিউলে নেই। দায়বদ্ধতার দিক থেকে আপাতত এটা করছি। এটা স্থায়ী কাজ নয়। মুল কাজ শেষ হলে এটা তুলে নতুন করে করা হবে।