ঢাকা ১১:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফেনীর ভূমি অফিসে ‘পিয়ন সিন্ডিকেট’

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ১১:২৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
  • / ৫৬ Time View
Print

মোহাম্মদ হানিফ,স্টাফ রিপোর্টার ফেনী:

ফেনী পৌর ভূমি অফিস ও সদর উপজেলা ভূমি অফিস ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র—এমন অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। আর সেই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পৌর ভূমি অফিসের পিয়ন নাসির। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও তার প্রভাব ও কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষ তাকে ‘অঘোষিত ভূমি কর্মকর্তা’ বলেই চেনে। জমাখারিজ, নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, অর্পিত সম্পত্তি ও বিরোধপূর্ণ জমির ফাইল নিষ্পত্তিসহ নানা কাজে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফেনী সদর ভূমি অফিসের নাজির নজরুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার মশিউর রহমানের সহযোগিতায় নাসির দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। আর এসব কাজে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার নীরব সহযোগিতাও পাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসিরকে বিভিন্ন সময় অন্যত্র বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তিনি আবারও ফেনী পৌর কিংবা সদর ভূমি অফিসে ফিরে আসেন। এ নিয়ে অফিসপাড়ায় নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি নিজের পছন্দের কর্মস্থলে বারবার ফিরে আসেন।
ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, অফিসের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গেলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। কিন্তু নাসিরের মাধ্যমে গেলে অল্প সময়েই কাজ হয়ে যায়—তবে এর জন্য গুনতে হয় বাড়তি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সেবাগ্রহীতা বলেন, “নাসির নিজেকে অফিসের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, কোন ফাইল কোথায় যাবে, কার স্বাক্ষর লাগবে—সব তার নিয়ন্ত্রণে।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনীর পাঁচগাছিয়া এলাকায় নাসিরের বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে। এলাকায় একাধিক জমি, বাড়ি ও ব্যবসায়িক সম্পদের পাশাপাশি ফেনী সার্কিট হাউসের সামনে একটি দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়িও রয়েছে তার। সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাসিরকে সদর ও পৌর ভূমি অফিস এলাকায় সক্রিয় দেখা যায়। অফিসের বিভিন্ন টেবিলে ঘোরাফেরা, ফাইল তদবির, লোকজনের সঙ্গে দরকষাকষি এবং ‘ম্যানেজ’ করার আশ্বাস দিয়ে টাকা নেওয়া যেন তার নিত্যদিনের কাজ।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ভূমি সংক্রান্ত জটিল ফাইলগুলোতে নাসিরের সুপারিশ ছাড়া অগ্রগতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নামজারি ও বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির ফাইলে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমে ফাইল গেলে দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীরা নানা হয়রানির শিকার হন।
এদিকে নাজির নজরুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করেই নাসির বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেন। অনেক সময় অফিসের বাইরেও দরকষাকষি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সচেতন মহল বলছে, ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলা দালালচক্র ও অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। দুর্নীতির এমন অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদককে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি সংশ্লিষ্টরা। তবে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ফেনীর ভূমি অফিসে ‘পিয়ন সিন্ডিকেট’

Update Time : ১১:২৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
Print

মোহাম্মদ হানিফ,স্টাফ রিপোর্টার ফেনী:

ফেনী পৌর ভূমি অফিস ও সদর উপজেলা ভূমি অফিস ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র—এমন অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। আর সেই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পৌর ভূমি অফিসের পিয়ন নাসির। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও তার প্রভাব ও কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষ তাকে ‘অঘোষিত ভূমি কর্মকর্তা’ বলেই চেনে। জমাখারিজ, নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, অর্পিত সম্পত্তি ও বিরোধপূর্ণ জমির ফাইল নিষ্পত্তিসহ নানা কাজে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফেনী সদর ভূমি অফিসের নাজির নজরুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার মশিউর রহমানের সহযোগিতায় নাসির দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। আর এসব কাজে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার নীরব সহযোগিতাও পাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসিরকে বিভিন্ন সময় অন্যত্র বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তিনি আবারও ফেনী পৌর কিংবা সদর ভূমি অফিসে ফিরে আসেন। এ নিয়ে অফিসপাড়ায় নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি নিজের পছন্দের কর্মস্থলে বারবার ফিরে আসেন।
ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, অফিসের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গেলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। কিন্তু নাসিরের মাধ্যমে গেলে অল্প সময়েই কাজ হয়ে যায়—তবে এর জন্য গুনতে হয় বাড়তি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সেবাগ্রহীতা বলেন, “নাসির নিজেকে অফিসের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, কোন ফাইল কোথায় যাবে, কার স্বাক্ষর লাগবে—সব তার নিয়ন্ত্রণে।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনীর পাঁচগাছিয়া এলাকায় নাসিরের বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে। এলাকায় একাধিক জমি, বাড়ি ও ব্যবসায়িক সম্পদের পাশাপাশি ফেনী সার্কিট হাউসের সামনে একটি দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়িও রয়েছে তার। সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাসিরকে সদর ও পৌর ভূমি অফিস এলাকায় সক্রিয় দেখা যায়। অফিসের বিভিন্ন টেবিলে ঘোরাফেরা, ফাইল তদবির, লোকজনের সঙ্গে দরকষাকষি এবং ‘ম্যানেজ’ করার আশ্বাস দিয়ে টাকা নেওয়া যেন তার নিত্যদিনের কাজ।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ভূমি সংক্রান্ত জটিল ফাইলগুলোতে নাসিরের সুপারিশ ছাড়া অগ্রগতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নামজারি ও বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির ফাইলে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমে ফাইল গেলে দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীরা নানা হয়রানির শিকার হন।
এদিকে নাজির নজরুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করেই নাসির বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেন। অনেক সময় অফিসের বাইরেও দরকষাকষি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সচেতন মহল বলছে, ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলা দালালচক্র ও অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। দুর্নীতির এমন অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদককে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি সংশ্লিষ্টরা। তবে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।