ঢাকা ১২:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎লুথার‍্যান হাসপাতালে চিকিৎসা নাকি বাণিজ্য,কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়াই গাইনী বিশেষজ্ঞ ‎

নিজেস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৮:১৪:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • / ১৯ Time View
Print




‎মোঃ সজিব সরদার,স্টাফ রিপোর্টার : পটুয়াখালীর দুমকীতে লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশে(LHCB)কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়াই গাইনী বিশেষজ্ঞ পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডা. তাহিরা মুরতাজার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগীকে অহেতুক হাসপাতালে ভর্তি, স্বাভাবিক ডেলিভারির পরিবর্তে অতিরিক্ত সিজার করানোসহ নানা অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

‎জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও বিডিজবস ডটকমে গাইনী বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে আবেদনকারীদের ডিজিও/এফসিপিএস ডিগ্রিধারী হওয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ডা. তাহিরা মুরতাজার এসব ডিগ্রির কোনোটিই নেই।

‎তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার আদাবরে অবস্থিত লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেন। পরে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ডা. তাহিরাকে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ২০২৫ সালের ১ জুন দুমকীতে গাইনী বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান করেন।
‎ইভানজেলিক্যাল লুথারান চার্চ ইন আমেরিকার (ইএলসিএ) গ্লোবাল মিশন ইউনিটের অর্থায়নে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ (এলএইচসিবি)। মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্যাথলজি, অ্যাম্বুলেন্স সেবাসহ বিভিন্ন কমিউনিটি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা শুরু হয়। শুরুতে সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ২০২৩ সাল থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বেতন-ভাতা জটিলতা ও কর্মী ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন পরিচালক হেলেন রেমা চাকরি ছাড়েন। পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. গ্রেনার মারাক।
‎এদিকে প্রতিবেদকের হাতে থাকা ডা. তাহিরা মুরতাজার জীবনবৃত্তান্ত ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা তার নেই। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি না থাকলেও তিনি সিজারসহ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
‎স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ১৩ জুলাই ফাহিমা আক্তার নামে এক গর্ভবতী নারীর সিজার করতে গিয়ে রোগীর মূত্রথলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হলে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সমঝোতা করে চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
‎এছাড়া চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরিণত বয়সী এক নবজাতকের সিজারের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শিশুটিকে প্রথমে পটুয়াখালী, পরে বরিশাল এবং সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। এ ঘটনাতেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করে বলে জানা গেছে।
‎এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. তাহিরা মুরতাজা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি এ বিষয়ে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ড. গ্রেনার মারাকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
‎লুথার‍্যান হেলথ কেয়ারের নির্বাহী পরিচালক ড. গ্রেনার মারাক বলেন, “নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডা. তাহিরাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।” মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীরা বেশি সম্মানী দাবি করেছিলেন। এছাড়া দূরত্ব ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণ দেখিয়ে তারা যোগদান করতে রাজি হননি।”
‎দুমকী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর শহীদুল হাসান শাহীন বলেন, “ওই ডাক্তারের নিয়োগ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়া কেউ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন না। পিজিটি থাকলে ছোটখাটো অপারেশন করতে পারবেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞ পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না।”
‎পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে প্রয়োজনীয় ডিগ্রি ছাড়া বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিয়মসিদ্ধ নয়।”
‎উল্লেখ্য, বর্তমানে লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশে প্রায় ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক ২ জন, ডাক্তার ৪ জন, কর্মকর্তা ১১ জন, সেবিকা ৫ জন, হেলথ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট ৪ জন এবং অন্যান্য কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৪০ জন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

‎লুথার‍্যান হাসপাতালে চিকিৎসা নাকি বাণিজ্য,কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়াই গাইনী বিশেষজ্ঞ ‎

Update Time : ০৮:১৪:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
Print




‎মোঃ সজিব সরদার,স্টাফ রিপোর্টার : পটুয়াখালীর দুমকীতে লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশে(LHCB)কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়াই গাইনী বিশেষজ্ঞ পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডা. তাহিরা মুরতাজার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগীকে অহেতুক হাসপাতালে ভর্তি, স্বাভাবিক ডেলিভারির পরিবর্তে অতিরিক্ত সিজার করানোসহ নানা অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

‎জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও বিডিজবস ডটকমে গাইনী বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে আবেদনকারীদের ডিজিও/এফসিপিএস ডিগ্রিধারী হওয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ডা. তাহিরা মুরতাজার এসব ডিগ্রির কোনোটিই নেই।

‎তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার আদাবরে অবস্থিত লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেন। পরে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ডা. তাহিরাকে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ২০২৫ সালের ১ জুন দুমকীতে গাইনী বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান করেন।
‎ইভানজেলিক্যাল লুথারান চার্চ ইন আমেরিকার (ইএলসিএ) গ্লোবাল মিশন ইউনিটের অর্থায়নে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ (এলএইচসিবি)। মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্যাথলজি, অ্যাম্বুলেন্স সেবাসহ বিভিন্ন কমিউনিটি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা শুরু হয়। শুরুতে সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ২০২৩ সাল থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বেতন-ভাতা জটিলতা ও কর্মী ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন পরিচালক হেলেন রেমা চাকরি ছাড়েন। পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. গ্রেনার মারাক।
‎এদিকে প্রতিবেদকের হাতে থাকা ডা. তাহিরা মুরতাজার জীবনবৃত্তান্ত ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা তার নেই। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি না থাকলেও তিনি সিজারসহ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
‎স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ১৩ জুলাই ফাহিমা আক্তার নামে এক গর্ভবতী নারীর সিজার করতে গিয়ে রোগীর মূত্রথলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হলে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সমঝোতা করে চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
‎এছাড়া চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরিণত বয়সী এক নবজাতকের সিজারের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শিশুটিকে প্রথমে পটুয়াখালী, পরে বরিশাল এবং সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। এ ঘটনাতেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করে বলে জানা গেছে।
‎এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. তাহিরা মুরতাজা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি এ বিষয়ে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ড. গ্রেনার মারাকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
‎লুথার‍্যান হেলথ কেয়ারের নির্বাহী পরিচালক ড. গ্রেনার মারাক বলেন, “নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডা. তাহিরাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।” মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীরা বেশি সম্মানী দাবি করেছিলেন। এছাড়া দূরত্ব ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণ দেখিয়ে তারা যোগদান করতে রাজি হননি।”
‎দুমকী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর শহীদুল হাসান শাহীন বলেন, “ওই ডাক্তারের নিয়োগ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ছাড়া কেউ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন না। পিজিটি থাকলে ছোটখাটো অপারেশন করতে পারবেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞ পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না।”
‎পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে প্রয়োজনীয় ডিগ্রি ছাড়া বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিয়মসিদ্ধ নয়।”
‎উল্লেখ্য, বর্তমানে লুথার‍্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশে প্রায় ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক ২ জন, ডাক্তার ৪ জন, কর্মকর্তা ১১ জন, সেবিকা ৫ জন, হেলথ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট ৪ জন এবং অন্যান্য কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৪০ জন।