গডজিলা এল নিনোর প্রভাবে ৬ মাসে সাড়ে ৪ লক্ষ্য মৃত্যুর আশাঙ্কা,বাংলাদেশে ঝুঁকিতে ৬০০
- Update Time : ১১:৩৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৭ Time View

আবু তালেব বিশেষ প্রতিনিধি:শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ু গবেষকেরা। একই সময়ে বাংলাদেশে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়াতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে গবেষকদের হিসাবে উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭—এই ছয় মাসের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। সংস্থাটির হিসাবে, শুধু খুলনা অঞ্চলেই অতিরিক্ত প্রায় ৩১০ জনের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। তবে এসব সংখ্যা সরাসরি পর্যবেক্ষণভিত্তিক নয়; অতীতের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক এবং এল নিনোর সম্ভাব্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মডেলভিত্তিক অনুমান।
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। বছরের শেষ দিকে এটি খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এল নিনোর এই ঘটনাকে অনেক গবেষক ‘সুপার এল নিনো’ বা ‘গডজিলা-লেভেল’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে ‘সুপার এল নিনো’ বা ‘গডজিলা এল নিনো’ কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস নয়; WMO সাধারণত এল নিনোর তীব্রতাকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও খুব শক্তিশালী—এভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে।
বাংলাদেশে বাড়তে পারে তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকি
গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর
কারণে বাংলাদেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তে পারে। এর ফলে বয়স্ক মানুষ, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমিক এবং শীতল পরিবেশ বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অতিরিক্ত তাপের প্রভাব বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৩১০ জনের অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা পুরো দেশের সম্ভাব্য ৬০০-এর একটি বড় অংশ।
তবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বাস্তবে কত মানুষের মৃত্যু হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। স্থানীয় আবহাওয়া, মানুষের তাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা, স্বাস্থ্যসেবা, সতর্কতা ও সরকারি প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
শুধু তাপ নয়, বাড়তে পারে খরা-বন্যার ঝুঁকিও
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনও বদলে যেতে পারে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা ও খরা দেখা দিতে পারে, আবার কোথাও ভারী বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তনের প্রভাব কৃষি, পানি সরবরাহ ও খাদ্যনিরাপত্তায় পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব জনগোষ্ঠী আগে থেকেই তাপপ্রবাহ, বন্যা বা অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ লাখের বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই হিসাবের মধ্যে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য খরা, দাবানল, বন্যা বা অন্যান্য দুর্যোগে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ধরা হয়নি। গবেষণাটি এখনো পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন করেনি।
গবেষকদের হিসাবে, এল নিনোর প্রভাবে ওই সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত গরমের দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুপ্রক্রিয়া। তবে বর্তমান এল নিনো এমন একটি সময়ে ঘটছে, যখন মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও জানিয়েছে, খুব শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষকদের মতে, আগাম সতর্কতা, তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস, শীতলীকরণ কেন্দ্র, জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতে পারে।



















