👥 প্রতিনিধি তালিকা 📰 ই-পেপার
ঢাকা ১২:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফেসবুকে শেষ চিরকুট লিখে না-ফেরার দেশে শাল্লার প্লাবন

নিজেস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ১০:১০:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৩৩ Time View
Print

মান অভিমানের আড়ালে অদৃশ্য ক্ষত: ফেসবুকে শেষ চিরকুট লিখে না-ফেরার দেশে শাল্লার প্লাবন

স্টাফ রিপোর্টার তৌফিকুর রহমান তাহের:

হৃদয়ের গোপন জমাট বাঁধা অভিমান নাকি অন্য কোনো রহস্য? একটিমাত্র ছবিতে ঘেরা কিছু স্মৃতি আর মাত্র ছয়টি শব্দের আকুতি রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন এক যুবক।

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের মামুদনগর গ্রামের প্লাবন সরকার নামের এক হিন্দু যুবকের অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে গোটা এলাকায় জুড়ে নেমে এসেছে শোক ও চাঞ্চল্যের ছায়া।

বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গ্রামেরই তরুণ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তোলা কয়েকটি যৌথ ছবি পোস্ট করেন প্লাবন। ক্যাপশনে খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভারী এক বাক্য— “আমার মৃত্যুর একমাত্র কারণ শুধু তুমি।”
পোস্টটির রেশ কাটতে না কাটতেই ছড়িয়ে পড়ে প্লাবনের মৃত্যুর নির্মম খবর।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই গ্রামের হাবিবুর রহমান ও মঈনুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি প্লাবনের ঘরের পেছনের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।

সেখানে আড়ার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা প্লাবনকে তারা নিজেরা নিচে নামিয়ে খাটের ওপর রাখেন।

এরপর তারা বাজার থেকে পল্লী চিকিৎসক প্রদীপ দাসকে ডেকে আনেন। ঘটনা স্মরণ করে প্রদীপ দাস বলেন, “বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে হাবিবুর ও মঈনুল আমাকে এসে বলে, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাব, দ্রুত চলুন।’ আমি ওদের সাথে যাই। বাড়ি পৌঁছে তারা তড়িঘড়ি করে পেছনের দরজায় লাথি ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আমি ঘরে গিয়ে দেখি, প্লাবনের দেহ খাটে শোয়ানো। তারা আমাকে ব্লাড প্রেসার মাপতে বলে। আমি দৌড়ে প্রেসারের যন্ত্র নিয়ে এসে মেপে দেখি প্লাবনের কোনো সাড়াশব্দ নেই, তার প্রাণ স্পন্দন আগেই থেমে গেছে। এই কথাটুকু বলতেই তারা দুজন প্লাবনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সাথে নিয়ে চম্পট দেয়।”

ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত হাবিবুর ও মঈনুল আত্মগোপনে থাকায় এবং তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে মঈনুলের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম আবেগ ও আক্ষেপ মিশিয়ে বলেন, “আমার ভাই ওদের সাথে চলাফেরা করত, বাজারে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করত। এই ঘটনার পেছনে যদি আমার ভাইয়ের কোনো অপরাধ থেকে থাকে, তবে তারও যেন বিচার হয়। তবে আমরা জানতাম প্লাবন ও হাবিবুরের মধ্যে গভীর একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক ছিল, যা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়।

এ নিয়ে ওদের মধ্যে বেশ কয়েকবার দ্বন্দ্বও হয়েছে, যা নিয়ে বাজারে মানুষ নানা কথাবার্তা বলত।”

খবর পেয়ে শাল্লা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্লাবনের নিথর দেহ উদ্ধার করে। শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল আহমেদ জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে। এটি কি আত্মহনন, নাকি এর পেছনে কোনো প্ররোচনা বা বড় কোনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য লুকিয়ে আছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আসা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একফোঁটা অভিমান আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রহস্য রেখে চলে যাওয়া প্লাবনের শেষ চিঠিটি এখন পুরো মামুদনগর গ্রামের মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে—কোন কষ্টের ভার সইতে না পেরে এই বিদায়?

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ফেসবুকে শেষ চিরকুট লিখে না-ফেরার দেশে শাল্লার প্লাবন

Update Time : ১০:১০:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
Print

মান অভিমানের আড়ালে অদৃশ্য ক্ষত: ফেসবুকে শেষ চিরকুট লিখে না-ফেরার দেশে শাল্লার প্লাবন

স্টাফ রিপোর্টার তৌফিকুর রহমান তাহের:

হৃদয়ের গোপন জমাট বাঁধা অভিমান নাকি অন্য কোনো রহস্য? একটিমাত্র ছবিতে ঘেরা কিছু স্মৃতি আর মাত্র ছয়টি শব্দের আকুতি রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন এক যুবক।

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের মামুদনগর গ্রামের প্লাবন সরকার নামের এক হিন্দু যুবকের অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে গোটা এলাকায় জুড়ে নেমে এসেছে শোক ও চাঞ্চল্যের ছায়া।

বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গ্রামেরই তরুণ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তোলা কয়েকটি যৌথ ছবি পোস্ট করেন প্লাবন। ক্যাপশনে খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভারী এক বাক্য— “আমার মৃত্যুর একমাত্র কারণ শুধু তুমি।”
পোস্টটির রেশ কাটতে না কাটতেই ছড়িয়ে পড়ে প্লাবনের মৃত্যুর নির্মম খবর।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই গ্রামের হাবিবুর রহমান ও মঈনুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি প্লাবনের ঘরের পেছনের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।

সেখানে আড়ার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা প্লাবনকে তারা নিজেরা নিচে নামিয়ে খাটের ওপর রাখেন।

এরপর তারা বাজার থেকে পল্লী চিকিৎসক প্রদীপ দাসকে ডেকে আনেন। ঘটনা স্মরণ করে প্রদীপ দাস বলেন, “বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে হাবিবুর ও মঈনুল আমাকে এসে বলে, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাব, দ্রুত চলুন।’ আমি ওদের সাথে যাই। বাড়ি পৌঁছে তারা তড়িঘড়ি করে পেছনের দরজায় লাথি ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আমি ঘরে গিয়ে দেখি, প্লাবনের দেহ খাটে শোয়ানো। তারা আমাকে ব্লাড প্রেসার মাপতে বলে। আমি দৌড়ে প্রেসারের যন্ত্র নিয়ে এসে মেপে দেখি প্লাবনের কোনো সাড়াশব্দ নেই, তার প্রাণ স্পন্দন আগেই থেমে গেছে। এই কথাটুকু বলতেই তারা দুজন প্লাবনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সাথে নিয়ে চম্পট দেয়।”

ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত হাবিবুর ও মঈনুল আত্মগোপনে থাকায় এবং তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে মঈনুলের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম আবেগ ও আক্ষেপ মিশিয়ে বলেন, “আমার ভাই ওদের সাথে চলাফেরা করত, বাজারে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করত। এই ঘটনার পেছনে যদি আমার ভাইয়ের কোনো অপরাধ থেকে থাকে, তবে তারও যেন বিচার হয়। তবে আমরা জানতাম প্লাবন ও হাবিবুরের মধ্যে গভীর একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক ছিল, যা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়।

এ নিয়ে ওদের মধ্যে বেশ কয়েকবার দ্বন্দ্বও হয়েছে, যা নিয়ে বাজারে মানুষ নানা কথাবার্তা বলত।”

খবর পেয়ে শাল্লা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্লাবনের নিথর দেহ উদ্ধার করে। শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল আহমেদ জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে। এটি কি আত্মহনন, নাকি এর পেছনে কোনো প্ররোচনা বা বড় কোনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য লুকিয়ে আছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আসা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একফোঁটা অভিমান আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রহস্য রেখে চলে যাওয়া প্লাবনের শেষ চিঠিটি এখন পুরো মামুদনগর গ্রামের মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে—কোন কষ্টের ভার সইতে না পেরে এই বিদায়?