ঢাকা ০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুলিশ কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে আওয়ামী লীগ কর্মীকে বিএনপি বানানোর অভিযোগ চৌগাছায় রবিউলকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের দাবি

Reporter Name
  • Update Time : ০২:৪৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৩৭ Time View
Print

যশোর প্রতিনিধি :যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার রবিউল ইসলামকে ঘিরে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নথি, পুরোনো মামলার কাগজপত্র এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্যে রবিউল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। একদিকে তাকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রবিউল ইসলাম যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মৃত কেরামত আলীর ছেলে।গত ১ অক্টোবর রাত সোয়া ১১টার দিকে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার করে চৌগাছা থানা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
রবিউল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বরের একটি নথি সামনে এসেছে। সেখানে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এস এম হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ওই নথিতে রবিউল ইসলামকে ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, পুরোনো ওই রাজনৈতিক পরিচয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য এবং বিশেষ সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করেই চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে গ্রেপ্তারের পরদিনই স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের কাছে তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার নথি থাকায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রবিউলকে আদালতে পাঠানোর পর চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রবিউলের ছেলে আলামিন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি ওসি মামুনুর রশিদসহ অভিযানিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন। এদিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার দাবি, রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে যশোর আদালতে দায়ের করা একটি জমিজমা সংক্রান্ত মামলার নথিতে রবিউল ইসলাম নিজেকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ওই মামলার নথিতে তিনি মামলার প্রতিপক্ষকে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব নথি বর্তমানে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চৌগাছা উপজেলার গুয়াতলী গ্রামের বাজে খানপুর এলাকায় মোস্তফার পোল্ট্রি ফার্মের কাছে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে রবিউলের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডে রবিউল ইসলামকে বিএনপির সদস্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাড়ায়নপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, বিগত ১৩ সালে রবিউল আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিল সেই কমিটি ১৮ সালে বিলুপ্ত হয় এরপরে সে বিএনপির সাথেই আছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, রবিউলও একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপির পরিচয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য আজিজুল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সেলিম রেজা, চৌগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম এবং যশোর জেলা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মহিদুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রবিউল ইসলাম প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি, পুলিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগও তারা করেছেন। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির নাম ব্যবহারকারী একটি সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী রাতারাতি বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও বলেন, “যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তারা যদি হঠাৎ করে বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নারায়ণপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ এখন বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা অর্থের বিনিময়ে এসব ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, এভাবে দলীয় পরিচয় বিক্রি বা পরিবর্তনের সুযোগ অব্যাহত থাকলে বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে। একই সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রবিউলের মতো আরও অনেক ব্যক্তি চৌগাছা উপজেলায় রয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। বর্তমানে তারা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, এখনই এ বিষয়ে দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদীদের আলাদা করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।বিএনপির এক পক্ষের অভিযোগ, রবিউলকে গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ওসির বিরুদ্ধে ঘুষসহ নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে রবিউলের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে।
অপর পক্ষের দাবি, ওসি মামুনুর রশিদ যোগদানের পর মাদক, চোরাচালান ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, ওই মহলই পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছে। রবিউল ইসলামের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে চৌগাছায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনি আসলে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং গ্রেপ্তারের পর হঠাৎ করে তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করা হলো? স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় প্যাড বা মৌখিক দাবির পাশাপাশি পুরোনো দলীয় নথি, সাংগঠনিক রেকর্ড, মামলা-মোকদ্দমার কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা আলামিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

পুলিশ কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে আওয়ামী লীগ কর্মীকে বিএনপি বানানোর অভিযোগ চৌগাছায় রবিউলকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের দাবি

Update Time : ০২:৪৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Print

যশোর প্রতিনিধি :যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার রবিউল ইসলামকে ঘিরে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নথি, পুরোনো মামলার কাগজপত্র এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্যে রবিউল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। একদিকে তাকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রবিউল ইসলাম যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মৃত কেরামত আলীর ছেলে।গত ১ অক্টোবর রাত সোয়া ১১টার দিকে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার করে চৌগাছা থানা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
রবিউল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বরের একটি নথি সামনে এসেছে। সেখানে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এস এম হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ওই নথিতে রবিউল ইসলামকে ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, পুরোনো ওই রাজনৈতিক পরিচয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য এবং বিশেষ সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করেই চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে গ্রেপ্তারের পরদিনই স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের কাছে তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার নথি থাকায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রবিউলকে আদালতে পাঠানোর পর চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রবিউলের ছেলে আলামিন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি ওসি মামুনুর রশিদসহ অভিযানিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন। এদিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার দাবি, রবিউলকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ওসি মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে যশোর আদালতে দায়ের করা একটি জমিজমা সংক্রান্ত মামলার নথিতে রবিউল ইসলাম নিজেকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ওই মামলার নথিতে তিনি মামলার প্রতিপক্ষকে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব নথি বর্তমানে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চৌগাছা উপজেলার গুয়াতলী গ্রামের বাজে খানপুর এলাকায় মোস্তফার পোল্ট্রি ফার্মের কাছে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে রবিউলের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডে রবিউল ইসলামকে বিএনপির সদস্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাড়ায়নপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, বিগত ১৩ সালে রবিউল আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিল সেই কমিটি ১৮ সালে বিলুপ্ত হয় এরপরে সে বিএনপির সাথেই আছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, রবিউলও একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপির পরিচয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য আজিজুল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সেলিম রেজা, চৌগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম এবং যশোর জেলা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মহিদুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রবিউলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রবিউল ইসলাম প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করতেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি, পুলিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগও তারা করেছেন। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির নাম ব্যবহারকারী একটি সুবিধাবাদী চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী রাতারাতি বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও বলেন, “যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তারা যদি হঠাৎ করে বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নারায়ণপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ এখন বিএনপির পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা অর্থের বিনিময়ে এসব ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, এভাবে দলীয় পরিচয় বিক্রি বা পরিবর্তনের সুযোগ অব্যাহত থাকলে বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে। একই সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রবিউলের মতো আরও অনেক ব্যক্তি চৌগাছা উপজেলায় রয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। বর্তমানে তারা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, এখনই এ বিষয়ে দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মী ও সুবিধাবাদীদের আলাদা করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।বিএনপির এক পক্ষের অভিযোগ, রবিউলকে গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ওসির বিরুদ্ধে ঘুষসহ নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে রবিউলের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে।
অপর পক্ষের দাবি, ওসি মামুনুর রশিদ যোগদানের পর মাদক, চোরাচালান ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, ওই মহলই পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছে। রবিউল ইসলামের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে চৌগাছায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনি আসলে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং গ্রেপ্তারের পর হঠাৎ করে তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করা হলো? স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় প্যাড বা মৌখিক দাবির পাশাপাশি পুরোনো দলীয় নথি, সাংগঠনিক রেকর্ড, মামলা-মোকদ্দমার কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা আলামিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি