ঢাকা ১১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোমরা স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায়ে গতি, অবকাঠামো সংকটে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০২:৪৬:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৪৪ Time View
Print

জি এম আব্বাস উদ্দিন সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:- দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে সরকারি রাজস্বও। তবে অবকাঠামো সংকট, পার্কিং জট ও শেডের অভাবে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে আছেন। ১লা সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত বন্দরের সার্বিক চিত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
আমদানি-রপ্তানি ও রাজস্ব আদায়ের চিত্র*
ভোমরা কাস্টমস হাউজ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) এই বন্দর দিয়ে ১৫ লাখ ৪ হাজার ১৭০ টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে যার মূল্য ১,৬৮৬ কোটি টাকা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ৫৯ হাজার ৬৯৩টি ট্রাকে ৮ হাজার ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ২০ লাখ ৮২ হাজার টন পণ্য আমদানি এবং ২ হাজার ৯৩৭টি ট্রাকে ৩ হাজার ৪০৬ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ (১-৭ সেপ্টেম্বর) এর হিসাব:মোট আমদানি প্রায় ২,৫০০ ট্রাক, মূল্য প্রায় ২২০ কোটি টাকা। প্রধান পণ্য – চাল, কয়লা, পাথর, কাঁচা মরিচ, ফল ও কাঁচামাল।

মোট রপ্তানি:প্রায় ৩৫০ ট্রাক, মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। প্রধান পণ্য – তৈরি পোশাক, জুট ইয়ার্ন, জুস, চিপস।
–
রাজস্ব আদায় এই ৭ দিনে প্রায় ২১-২৩ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ:
ভোমরা কাস্টমস হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা *মোস্তফা কামাল* বলেন, “দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৪০% ভোমরাসহ স্থলবন্দর দিয়ে হয়। আমরা রপ্তানি পণ্য দ্রুত ছাড়করণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা বদ্ধপরিকর।

ভোমরা স্থলবন্দরের উপপরিচালক*মামুন কবির তরফদার*বলেন, “বন্দরের গতি বাড়াতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ দরকার। ভোমরা দেশের প্রবৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভোমরা স্থলবন্দরের উপপরিচালক *মনিরুল ইসলাম* বলেন, “নতুন ২৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এতে নতুন পার্কিং, শেড ও ওয়্যারহাউজ হবে। তখন বন্দরের ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা:-ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক *আবু মুসা* বলেন, “ভারতের বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো বড় অর্জন। তবে অন্য বন্দরে ফল আমদানিতে ওজন ছাড় ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হলেও ভোমরায় দেওয়া হয় না। এতে খরচ বেশি পড়ে।

একই সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম* বলেন, “অন্য বন্দরে প্রতি ট্রাক ডালিমে কার্টনের ওজন বাদ দেওয়া হয় এবং ১০ টনে ২ টন পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়। ভোমরায় কোনো ছাড় নেই। তাই ফল ব্যবসায়ীরা ভোমরা ছাড়ছে, রাজস্ব কমছে।

ভোমরা আমদানি-রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী*বলেন, বন্দরে পার্কিং ও শেড সংকটের কারণে ট্রাক ৩-৪ দিন আটকে থাকে। দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা আরও বাড়বে।

চেম্বার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী:
সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি *নাসিম ফারুক খান মিঠু* বলেন, ভোমরা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ জরুরি।

সাতক্ষীরা বড়বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রজব আলী*বলেন, ভোমরা দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হওয়ায় বাজারে দাম ৩০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় নেমেছে। আমদানি অব্যাহত থাকলে দাম আরও কমবে।

কয়লা আমদানিকারক আব্দুল জলিল বলেন, ইটভাটার মৌসুম সামনে, তাই কয়লার চাহিদা বেশি। ভোমরায় কয়লার জন্য আলাদা ইয়ার্ড দরকার।

বন্দরের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ*বর্তমানে বন্দরে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০ ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে ঢুকছে। কিন্তু পার্কিং ইয়ার্ডে মাত্র ২০০ ট্রাক রাখার জায়গা আছে। ফলে সড়কে যানজট লেগে থাকে।

তবে আশার কথা হলো, সরকারের নতুন প্রকল্পে ৪০০ ট্রাকের নতুন পার্কিং, ২টি ট্রান্সশিপমেন্ট শেড ও ৩টি ওয়্যারহাউজ নির্মাণ হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন এটি বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব ১,১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ভোমরা স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায়ে গতি, অবকাঠামো সংকটে ভোগান্তি

Update Time : ০২:৪৬:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

জি এম আব্বাস উদ্দিন সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:- দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে সরকারি রাজস্বও। তবে অবকাঠামো সংকট, পার্কিং জট ও শেডের অভাবে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে আছেন। ১লা সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত বন্দরের সার্বিক চিত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
আমদানি-রপ্তানি ও রাজস্ব আদায়ের চিত্র*
ভোমরা কাস্টমস হাউজ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) এই বন্দর দিয়ে ১৫ লাখ ৪ হাজার ১৭০ টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে যার মূল্য ১,৬৮৬ কোটি টাকা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ৫৯ হাজার ৬৯৩টি ট্রাকে ৮ হাজার ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ২০ লাখ ৮২ হাজার টন পণ্য আমদানি এবং ২ হাজার ৯৩৭টি ট্রাকে ৩ হাজার ৪০৬ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ (১-৭ সেপ্টেম্বর) এর হিসাব:মোট আমদানি প্রায় ২,৫০০ ট্রাক, মূল্য প্রায় ২২০ কোটি টাকা। প্রধান পণ্য – চাল, কয়লা, পাথর, কাঁচা মরিচ, ফল ও কাঁচামাল।

মোট রপ্তানি:প্রায় ৩৫০ ট্রাক, মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। প্রধান পণ্য – তৈরি পোশাক, জুট ইয়ার্ন, জুস, চিপস।
–
রাজস্ব আদায় এই ৭ দিনে প্রায় ২১-২৩ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ:
ভোমরা কাস্টমস হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা *মোস্তফা কামাল* বলেন, “দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৪০% ভোমরাসহ স্থলবন্দর দিয়ে হয়। আমরা রপ্তানি পণ্য দ্রুত ছাড়করণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা বদ্ধপরিকর।

ভোমরা স্থলবন্দরের উপপরিচালক*মামুন কবির তরফদার*বলেন, “বন্দরের গতি বাড়াতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ দরকার। ভোমরা দেশের প্রবৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভোমরা স্থলবন্দরের উপপরিচালক *মনিরুল ইসলাম* বলেন, “নতুন ২৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এতে নতুন পার্কিং, শেড ও ওয়্যারহাউজ হবে। তখন বন্দরের ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা:-ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক *আবু মুসা* বলেন, “ভারতের বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো বড় অর্জন। তবে অন্য বন্দরে ফল আমদানিতে ওজন ছাড় ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হলেও ভোমরায় দেওয়া হয় না। এতে খরচ বেশি পড়ে।

একই সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম* বলেন, “অন্য বন্দরে প্রতি ট্রাক ডালিমে কার্টনের ওজন বাদ দেওয়া হয় এবং ১০ টনে ২ টন পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়। ভোমরায় কোনো ছাড় নেই। তাই ফল ব্যবসায়ীরা ভোমরা ছাড়ছে, রাজস্ব কমছে।

ভোমরা আমদানি-রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী*বলেন, বন্দরে পার্কিং ও শেড সংকটের কারণে ট্রাক ৩-৪ দিন আটকে থাকে। দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা আরও বাড়বে।

চেম্বার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী:
সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি *নাসিম ফারুক খান মিঠু* বলেন, ভোমরা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ জরুরি।

সাতক্ষীরা বড়বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রজব আলী*বলেন, ভোমরা দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হওয়ায় বাজারে দাম ৩০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় নেমেছে। আমদানি অব্যাহত থাকলে দাম আরও কমবে।

কয়লা আমদানিকারক আব্দুল জলিল বলেন, ইটভাটার মৌসুম সামনে, তাই কয়লার চাহিদা বেশি। ভোমরায় কয়লার জন্য আলাদা ইয়ার্ড দরকার।

বন্দরের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ*বর্তমানে বন্দরে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০ ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে ঢুকছে। কিন্তু পার্কিং ইয়ার্ডে মাত্র ২০০ ট্রাক রাখার জায়গা আছে। ফলে সড়কে যানজট লেগে থাকে।

তবে আশার কথা হলো, সরকারের নতুন প্রকল্পে ৪০০ ট্রাকের নতুন পার্কিং, ২টি ট্রান্সশিপমেন্ট শেড ও ৩টি ওয়্যারহাউজ নির্মাণ হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন এটি বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব ১,১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।