ঢাকা ০১:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা ছয় দিন তেলের দামে পতন, ব্যারেল নামল ৯৮ ডলারে

স্টাফ রিপোর্টার
  • Update Time : ১০:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৩ Time View
Print

আবু তালেব:সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা ও চীনের চাহিদা কমার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে টানা ছয় দিন ধরে কমছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের আগস্টের পর এবারই প্রথম টানা ছয় দিন ধরে তেলের দামে এমন পতন দেখা গেল।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমেছে। গত পাঁচ দিনে এই তেলের দাম কমেছে ১০ শতাংশের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দামে সাম্প্রতিক পতনের পেছনে মূলত সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে নতুন হিসাব কাজ করছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় সচল করার উদ্যোগ এবং লোহিত সাগর অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরুর সম্ভাবনা বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

বাড়তে পারে তেলের সরবরাহ
সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়তে পারে।

সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা সাধারণত বাজারে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করে। বর্তমানে সেই প্রভাবই আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের চাহিদা নিয়েও সংশয়
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক চীনের তেল চাহিদা নিয়েও নতুন করে হিসাব করছেন বিশ্লেষকেরা। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, চলতি বছরের শেষ তিন মাসে চীনের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই।

চীন বর্তমানে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে। ফলে দেশটির আমদানি চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো রয়েছে
তবে তেলের বাজারের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোয় নতুন করে কোনো হামলা হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

এ কারণে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। নতুন কোনো সংঘাত বা গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা হলে বর্তমান দরপতনের চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকেও নজর বাজারের
এভারব্রাইট সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনালের কৌশলবিদ কেনি এনজি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈঠকের ফলাফল বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাঁর মতে, বৈঠকের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার আগে বাজারের সাময়িক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশে তেলের দাম কত হতে পারে?
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলার এবং প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রায় ৭৬ টাকা দাঁড়ায়।

তবে এই হিসাব কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ভিত্তিতে করা। বাংলাদেশে আমদানি করা তেলের চূড়ান্ত মূল্যের সঙ্গে পরিবহন, বিমা, বন্দর ও হ্যান্ডলিং, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক ও করও থাকে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের কাছাকাছি নামলেও বাংলাদেশের ভোক্তা পর্যায়ে একই হারে দাম কমবে—এমনটা সরাসরি বলা যায় না।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় নিম্নমুখী থাকলে আমদানি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব কীভাবে পড়ে, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

টানা ছয় দিন তেলের দামে পতন, ব্যারেল নামল ৯৮ ডলারে

Update Time : ১০:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

আবু তালেব:সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা ও চীনের চাহিদা কমার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে টানা ছয় দিন ধরে কমছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের আগস্টের পর এবারই প্রথম টানা ছয় দিন ধরে তেলের দামে এমন পতন দেখা গেল।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমেছে। গত পাঁচ দিনে এই তেলের দাম কমেছে ১০ শতাংশের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দামে সাম্প্রতিক পতনের পেছনে মূলত সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে নতুন হিসাব কাজ করছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় সচল করার উদ্যোগ এবং লোহিত সাগর অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরুর সম্ভাবনা বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

বাড়তে পারে তেলের সরবরাহ
সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়তে পারে।

সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা সাধারণত বাজারে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করে। বর্তমানে সেই প্রভাবই আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের চাহিদা নিয়েও সংশয়
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক চীনের তেল চাহিদা নিয়েও নতুন করে হিসাব করছেন বিশ্লেষকেরা। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, চলতি বছরের শেষ তিন মাসে চীনের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই।

চীন বর্তমানে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে। ফলে দেশটির আমদানি চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো রয়েছে
তবে তেলের বাজারের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোয় নতুন করে কোনো হামলা হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

এ কারণে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। নতুন কোনো সংঘাত বা গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা হলে বর্তমান দরপতনের চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকেও নজর বাজারের
এভারব্রাইট সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনালের কৌশলবিদ কেনি এনজি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈঠকের ফলাফল বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাঁর মতে, বৈঠকের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার আগে বাজারের সাময়িক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশে তেলের দাম কত হতে পারে?
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলার এবং প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রায় ৭৬ টাকা দাঁড়ায়।

তবে এই হিসাব কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ভিত্তিতে করা। বাংলাদেশে আমদানি করা তেলের চূড়ান্ত মূল্যের সঙ্গে পরিবহন, বিমা, বন্দর ও হ্যান্ডলিং, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক ও করও থাকে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের কাছাকাছি নামলেও বাংলাদেশের ভোক্তা পর্যায়ে একই হারে দাম কমবে—এমনটা সরাসরি বলা যায় না।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় নিম্নমুখী থাকলে আমদানি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব কীভাবে পড়ে, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।