শাল্লায় বার্ষিক লিজের শর্ত ভেঙে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের এক ভয়াবহ চিত্র
- Update Time : ০৮:১৪:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
- / ১৪ Time View

তৌফিকুর রহমান তাহের,বিশেষ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জঃ
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় সরকারি “একসনা বন্দোবস্ত”বা বার্ষিক লিজের শর্ত ভেঙে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। উপজেলার কান্দিগাও গ্রামের আব্দুল করিম ও চব্বিশা গ্রামের সাদিকুর রহমানসহ একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের জারিকৃত লাল নিশান ও মৌখিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রকাশ্য দিবালোকে বাজারভিটায় পাকা ভবন নির্মাণ করে চলেছে। অভিযোগ উঠেছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে স্থানীয় প্রশাসন ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীর সাথে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন বা সমঝোতা করা হয়েছে।
সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী বাজারভিটা বা একসনা বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার স্থায়ী বা পাকা স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। লাইসেন্সের শর্তাবলীতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে, এসব জমিতে শুধুমাত্র অস্থায়ী বা কাঁচা ঘর তোলা যাবে। অথচ শাল্লার এই প্রভাবশালী চক্রটি সরকারের কোনো শর্তেরই তোয়াক্কা করছে না। সরেজমিনে দেখা গেছে, ইতোমধ্যেই ভবনের একতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি এই বাজারভিটা হস্তান্তর বা কেনাবেচার কোনো আইনি বিধান নেই। অথচ আব্দুল করিম নামের এক ব্যক্তি জমিটি জনৈক আব্দুল মন্নানের কাছ থেকে ক্রয় করেছেন বলে দাবি করছেন। আইনি ভিত্তিহীন এই হস্তান্তরের ওপর ভর করেই সেখানে গড়া হচ্ছে স্থায়ী স্থাপনা, যা ভূমি আইনের চরম লঙ্ঘন।
স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে ভূমি অফিস থেকে কয়েক দিন আগে নির্মাণাধীন ভবনে লাল নিশান টাঙিয়ে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই কঠোর অবস্থান টিকে ছিল মাত্র কয়েক দিন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শ্রমিকরা পুনরায় কাজ শুরু করে এবং তড়িঘড়ি করে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ করা হয়। স্থানীয় জনগণের প্রশ্ন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কার ইশারায় এবং কোন খুঁটির জোরে এই ঢালাই সম্পন্ন হলো?
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে খোদ ভবন মালিক সাদিকুর রহমানের বক্তব্যে। সাংবাদিকদের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন যে, জনৈক আব্দুল মজিদ নামের এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় স্থানীয় প্রশাসন এবং উপজেলার কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে টাকার বিনিময়ে বিষয়টি সমঝোতা করা হয়েছে। এই সমঝোতার পরেই মূলত লাল নিশানের তোয়াক্কা না করে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হয়। সাদিকুর রহমান দম্ভোক্তি করে আরও বলেন, এই বাজারে এমন আরও একসনা ভিটা আছে যেখানে ২/৩ তলা বিল্ডিং করা হয়েছে, তাদের ধরছে না কেন?
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, ছাদ ঢালাইয়ের খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি নিজে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে। তবে তার এই বক্তব্যকে ‘দায়সারা’ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢালাই হওয়ার সময় দায়িত্বশীলরা কোথায় ছিলেন? কেন তাৎক্ষণিকভাবে লিজ বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
সরকারি জমি দখল করে এমন প্রকাশ্য অনিয়মে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, লিজের শর্ত ভঙ্গ করা মানেই লিজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়া। অথচ উচ্ছেদ না করে ‘সমঝোতা’র সুযোগ দেওয়া প্রশাসনের পেশাদারিত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
শাল্লার সরকারি সম্পদ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের উচ্চতর হস্তক্ষেপ এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। আইন ভঙ্গকারী দখলদার এবং তাদের সুবিধাভোগী মদদদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে উপজেলার সকল সরকারি জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

















