যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপির জনসভা যারা দোসর বলে, তারই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করছে : প্রধানমন্ত্রী
- Update Time : ০৮:১০:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ৫২ Time View

আতাউর রহমান (যশোর)
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্তব্য করেছেন, জনগণের শান্তি নষ্ট করে হরতাল করার সেই সুযোগ আমরা কাউকে দেব না। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের শান্তি নষ্ট করার সুযোগ কাউকে দেবে না বিএনপি। ১৭৩ দিন হরতালের সুযোগ দেব না।’
জামায়াতের নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপিকে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর বলে, তারই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করছে। যারা স্বৈরাচারের সাথে ঢাকার বাইরে মিটিং করে তারা জনগণের জন্য কখনো কাজ করে না। যারা ৭১, ২০০৮ সালে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, তারা ২০২৬ সালেও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের বিষয সতর্ক থাকতে হবে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড হাজার থেকে লাখ লাখ, এরপর লাখ লাখ থেকে কোটিতে পৌঁছাবে। এছাড়া বন্ধ অনেক কল-কারখানা কয়েক মাসের মধ্যে চালু করবে সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘যারা জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছে, তারা এখন বিএনপিকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে। যারা বক্তব্যে জোরে জোরে কথা বলে তারাই ফ্যাসিবাদের সাথে এখন বিভিন্ন জায়গায় মিটিং করছে। বিএনপির নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা দেশের কিছু মানুষ ও দল বাধাগ্রস্তের চেস্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসাথে নারীদের রান্নার কষ্ট লাঘবে এবার ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একইসাথে তিনি বলেন, জনগণের শান্তি নষ্ট করবে, এমন কাজ করতে দেয়া হবে না। কোনো টিকিট বিক্রি নয়, জনগণের জন্য কাজ করবে বিএনপি সরকার।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণ সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি তা বাস্তবায়ন করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজ শেষ করবে এই সরকার। দেশের জনগণই বিএনপির রাজনীতি। দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীদের পেছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিএনপির ওপর দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত করতে চায় একটি মহল, যারা নির্বাচনের আগে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছিল। দেশের সেবা করার জন্য বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে জনগণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ শান্তিতে ও ভালোভাবে বসবাস করতে চায়। জনগণ বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। যারা স্বাধীনতার সময় জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল, তারা এখনও জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়াবে, আর বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করবে।
নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, মা-বোনদের শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা মেট্রিক পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন, তখন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। তার অসমাপ্ত কাজ পূরণের লক্ষ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করব। শুধু মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব না, একই সঙ্গে আমাদের যে মেয়েরা ভাল রেজাল্ট করতে পারবে তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব সরকার থেকে যাতে করে তারা আরও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারে।’
মা-বোনদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মা-বোনদের একটি কারণে খুব কষ্ট হয়, রান্নাবাড়ির ব্যাপারে কষ্ট হয়; সেটি গ্রামের মা-বোনই হোক, সেটি শহরের মা-বোনই হোক। আমরা যেমন সারা দেশের মায়েদের কাছে আমরা যেমন ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি, সেরকম আরেকটি কাজ দিতে চাই সেটি হবে এলপিজি কার্ড। এলপিজি গ্যাস এটি আমরা মা-বোনদেরকে পৌঁছে দিব যাতে করে মা-বোনদেরকে রান্নাবান্নার জন্য কষ্ট করতে না হয়।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে সোমবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এখন তিনি শার্শার উলশি খাল খননের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দুপুর ১২টায় শার্শায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলশী খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করেন এবং সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। এরপর দুপুর ২টায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি যশোর ইন্সটিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন।
সমাবেশে খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে বিএনপি ক্ষমতায় এসে দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দেশে আমরা শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া সেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করব। ইনশাল্লাহ আগামী ৫ বছরে আমরা চেষ্টা করব সারাদেশে এই উলশী খালের মতো প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল আমরা খনন করতে চাই যাতে করে গ্রামের মানুষ, গ্রামে বসবাসকারী মানুষ, কৃষক ভাই-বোনেরা, এলাকাবাসী এবং তরুণ সমাজের সদস্যরা তরুণরা হোক বিভিন্ন রকম আয় রোজগারের সুবিধা সেখান থেকে করতে পারে আমরা খাল খনন সেই জন্য করতে চাই।’
নারী প্রধান পরিবারের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম খাল খনন করব, আমরা আমাদের ওয়াদা রেখেছি। মা-বোনদের স্বাবলম্বী করার জন্য আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেব। ইনশাল্লাহ আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমরা চেষ্টা করব সকল গ্রাম, দেশের সকল গ্রামে সকল মায়েদের হাতে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ। আমরা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মায়ের কাছে প্রতি নারী পরিবারের প্রধানের কাছে আমরা মাসের পক্ষ থেকে ইনশাল্লাহ আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব যাতে করে তারা তাদের সন্তানদের দেখভাল করতে পারে, তাদের সন্তানের পড়াশোনা দেখাশুনা করতে পারে ভাল করে। তাদের সন্তানকে দু-চারটি ভাল ফল খাওয়াতে পারে যাতে করে তারা মা-বোনেরা একই সাথে সেই আড়াই হাজার টাকা থেকে ছোট ছোট উদ্যোক্তা গ্রহণ করতে পারেন-হাঁস পালন, মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন এরকম কাজের মাধ্যমে যাতে মা-বোনদের একটা নিজের রুজি রোজগারের ব্যবস্থা হয় সেটি আমরা করতে চাই।’
কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে নেওয়া পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম যে বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষক ভাইদের জন্য আমরা কৃষি কার্ড দেব। কৃষক ভাইদের আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ যেটা আছে সেটা আমরা মওকুফের ব্যবস্থা করব। আল্লাহর রহমতে আমরা সেই কাজও শুরু করেছি এবং সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই আমরা কৃষকদের যাদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ ছিল তাদের সেই কৃষি ঋণ আমরা মওকুফ করেছি। এছাড়া বিভিন্ন চিনিকল ও কলকারখানা যেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বহু মানুষ বেকার হয়ে গিয়েছে, সেই কলকারখানাগুলো চালুর ব্যবস্থা ইনশাল্লাহ আমরা করব। আগামী দুই-চার মাসের মধ্যে ইনশাল্লাহ বাংলাদেশের অনেক বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালু করা সম্ভব হবে যার ফলে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের অনেক কল-কারখানা বন্ধ রয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অনেক কল-কারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশপাশি অনেক দেশে জনশক্তি রফতানি সীমিত ও বন্ধ রয়েছে। সেইসব দেশের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে। দ্রুতই অনেক দেশে আমরা জনশক্তি রফতানিতে গতি আনতে পারবো।
তিনি সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে-মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারিভাবে সম্মানীর ব্যবস্থা করব। আলহামদুলিল্লাহ, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করেছি। দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিএনপি যতদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, ইনশাআল্লাহ, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি জবান আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করব।’
জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন খোকন।
এর আগে সোমবার দুপুর ১২টায় যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাঁচ দশক আগে জিয়াউর রহমানের যেখান থেকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যশোরের সেই উলশী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন তার ছেলে তারেক রহমান। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এ খনন কার্যক্রমের সূচনা শেষে খালপাড়ে সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর দুপুর ২টায় তিনি যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তুর উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষকে অসুস্থ হওয়া থেকে দূরে রাখা। আমরা যদি দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই; তাহলে সুস্থ একটি জাতি প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই হসপিটালটি যখন হবে, স্বাভাবিকভাবে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০০ রোগীর ব্যান্ডেজ, ওষুধ বা অপারেশন থিয়েটারের যেসব বিষয় থাকে সেগুলো প্রোভাইড করা হবে। হয়তো দেখা যাবে রোগীর সংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়ছে; কিন্তু সরকারেরও একটা ক্যাপাসিটি আছে। সেজন্যই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে প্রিভেনশনটার ওপর জোর দেবো। আমরা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করবো যাতে বড় বড় অসুখ-বিসুখ থেকে কিভাবে দূরে রাখা সম্ভব। তাছাড়া আমরা চেষ্টা করছি প্রাইভেট পার্টনারশিপ। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী থাকলে চিকিৎসার সুবিধা থেকে অনেককে বঞ্চিত হতে হয় বা হাসপাতালের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সম্ভব হয় না। তাই যেটা করতে চাচ্ছি প্রথম পর্যায়ে ভর্তি হওয়া এবং গুরুতর বিবেচনায় বেসরকারি হাসপাতালে রোগী প্রেরণ করা। সরকারের পক্ষ থেকেই আমরা সেই খরচ বহন করবো।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ভিত্তি প্রস্থর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যশোরে ৫০০ শয্যা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলো।



















