ঢাকা ১০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁয়ে এক প্রভাবশালী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যায়ের প্রয়ান

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৭:৪৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
  • / ২৫ Time View
Print

এ কে আজাদ,ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:ঠাকুরগাঁও-২ আসনের টানা সাতবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম আর নেই। (ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিউন)

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার ২৮ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে জননেতা, সংগঠক, সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কারিগর এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের আস্থার প্রতীক।

পরিবারিক সূত্রে জনা গেছে ঢাকা থেকে মরদেহ তার নিজ বাড়ি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে নিয়ে এসে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে।

১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দবিরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে টানা সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

ঠাকুরগাঁও-২ আসন (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈলের একাংশ) থেকে তিনি প্রথম ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিপিবির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিজয় লাভ করেন।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম, ২০০৮ সালের নবম, ২০১৪ সালের দশম এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এত দীর্ঘ সময় ধরে জনসমর্থন ধরে রাখার নজির খুব কম রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সমাজকল্যাণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব উল্লেখযোগ্য।

দলীয় রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তৃণমূল রাজনীতিকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততা তাঁকে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।রাজনীতির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে চা শিল্প সম্প্রসারণেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘রণবাগ ইসলামী টি এস্টেট’-এর মালিক ছিলেন এবং উত্তরবঙ্গে চা চাষের বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। তাঁর পরিবর্তে তাঁর ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজন ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ওই বছরের ৩ অক্টোবর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকার পর সম্প্রতি মে ২০২৬ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। কারামুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

দবিরুল ইসলামের মৃত্যুতে রাজনৈতিক সহকর্মী, বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকেই তাঁকে উত্তরবঙ্গের রাজনীতির জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ সংসদ সদস্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞ এই নেতার মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওবাসী হারালো তাদের পরিচিত এক রাজনৈতিক অভিভাবককে। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ঠাকুরগাঁয়ে এক প্রভাবশালী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যায়ের প্রয়ান

Update Time : ০৭:৪৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
Print

এ কে আজাদ,ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:ঠাকুরগাঁও-২ আসনের টানা সাতবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম আর নেই। (ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিউন)

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার ২৮ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে জননেতা, সংগঠক, সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কারিগর এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের আস্থার প্রতীক।

পরিবারিক সূত্রে জনা গেছে ঢাকা থেকে মরদেহ তার নিজ বাড়ি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে নিয়ে এসে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হবে।

১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দবিরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে টানা সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

ঠাকুরগাঁও-২ আসন (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈলের একাংশ) থেকে তিনি প্রথম ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিপিবির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিজয় লাভ করেন।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম, ২০০৮ সালের নবম, ২০১৪ সালের দশম এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এত দীর্ঘ সময় ধরে জনসমর্থন ধরে রাখার নজির খুব কম রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সমাজকল্যাণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব উল্লেখযোগ্য।

দলীয় রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তৃণমূল রাজনীতিকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততা তাঁকে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।রাজনীতির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে চা শিল্প সম্প্রসারণেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘রণবাগ ইসলামী টি এস্টেট’-এর মালিক ছিলেন এবং উত্তরবঙ্গে চা চাষের বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। তাঁর পরিবর্তে তাঁর ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজন ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ওই বছরের ৩ অক্টোবর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকার পর সম্প্রতি মে ২০২৬ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। কারামুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

দবিরুল ইসলামের মৃত্যুতে রাজনৈতিক সহকর্মী, বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকেই তাঁকে উত্তরবঙ্গের রাজনীতির জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ সংসদ সদস্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞ এই নেতার মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওবাসী হারালো তাদের পরিচিত এক রাজনৈতিক অভিভাবককে। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।