ঢাকা ০১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আদ্যাশক্তি মহামায়ার মর্ত্যে শুভ আগমন

মিলন বৈদ্য শুভ, প্রতিবেদক
  • Update Time : ১০:২২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৬ Time View
Print

মিলন বৈদ্য শুভ, প্রতিবেদক

আকাশে-বাতাসে এখন শারদীয়ার আগমনী সুর। শিউলি ফুলের সুবাস আর কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। মহালয়ার পুণ্যতিথিতে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোকে আবাহন ঘটছে আদ্যাশক্তি মহামায়ার।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে এরই মধ্যে ভক্তদের মাঝে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। তবে দেবী দুর্গার আগমন শুধু আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি-সম্প্রীতির এক চিরন্তন প্রতীক।

দশভূজা রূপে দেবীর আবির্ভাব
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, প্রাচীনকালে মহিষাসুর নামের এক প্রবল পরাক্রমশালী অসুরের অত্যাচারে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—তিন লোক অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। কঠোর তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর লাভ করে মহিষাসুর নিজেকে প্রায় অজেয় করে তোলে। তার অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন।
দেবতাদের সম্মিলিত তেজ ও শক্তি থেকে সৃষ্টি হয় এক জ্যোতির্ময়ী দেবীমূর্তি।
তিনিই দেবী দুর্গা বা আদ্যাশক্তি মহামায়া। দেবতারা তাঁদের শক্তিশালী অস্ত্র দেবীর হাতে তুলে দেন। ভগবান শিব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দেন সুদর্শন চক্র, ইন্দ্র দেন বজ্র, বায়ুদেব দেন ধনুকসহ বিভিন্ন দেবতা তাঁদের ঐশ্বরিক অস্ত্র প্রদান করেন। পর্বতরাজ হিমালয় দেবীকে দেন সিংহ বাহন।
দশ হাতে দশ অস্ত্র ধারণ করে দেবী হয়ে ওঠেন অজেয় দশভূজা।
মহিষাসুরের সঙ্গে মহাযুদ্ধ
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, সিংহের পিঠে আরোহণ করে দেবী দুর্গা মহিষাসুরের বিরুদ্ধে ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ নয় দিনের এই যুদ্ধে মহিষাসুর বারবার বিভিন্ন রূপ ধারণ করে দেবীকে পরাস্ত করার চেষ্টা করে।
অবশেষে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত ও বধ করেন। অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরের পতনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য ও ন্যায়ের জয়। এ কারণেই দেবী দুর্গা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে সমধিক পরিচিত।

দেবীর এই বিজয় শুধু পৌরাণিক একটি ঘটনা নয়; যুগে যুগে অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবেও তা বিবেচিত হয়ে আসছে।
অন্তরের অশুভ শক্তি দমনের শিক্ষা
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন। মহিষাসুরকে মানুষের অন্তরের বিভিন্ন অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। অহংকার, লোভ, কাম, ক্রোধ, মোহ ও স্বার্থপরতার মতো প্রবৃত্তি মানুষের বিবেক ও মানবিকতাকে আচ্ছন্ন করে।

দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্য তাই কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ভেতরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়াও এই উৎসবের অন্যতম শিক্ষা।
নারী শক্তির জাগরণের প্রতীক
দেবী দুর্গার দশভূজা রূপ নারী শক্তির জাগরণ ও সামর্থ্যেরও এক অনন্য প্রতীক। দেবীর মধ্যে শক্তি, সাহস, প্রজ্ঞা, মমতা ও করুণার যে সমন্বয় দেখা যায়, তা সমাজে নারীর মর্যাদা ও শক্তির এক গভীর বার্তা বহন করে।

অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভালোবাসা, মমতা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিও নারীর মধ্যে রয়েছে—দেবী দুর্গার আরাধনা সেই চেতনাকেই ধারণ করে।

শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার আহ্বান
দশ হাতে অস্ত্র ধারণ করলেও দেবী দুর্গার মুখাবয়বে ফুটে ওঠে মমতা ও করুণার প্রতিচ্ছবি। তাঁর আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা কামনা করেন সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায়, অশান্তি ও সংঘাত দূর হোক।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে গড়ে উঠুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি—দুর্গোৎসবের আনন্দ যেন সেই মানবিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে, এমন প্রত্যাশাই ভক্তদের।

আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের মহোৎসব
দুর্গাপূজা তাই শুধু প্রতিমা আরাধনার উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও কল্যাণবোধ জাগ্রত করারও এক মহোৎসব। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা মানুষের অন্তর থেকে অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীকী আহ্বান জানায়।

আদ্যাশক্তি মহামায়ার শুভ আগমনে পৃথিবী থেকে দূর হোক রোগ-শোক, অশান্তি, হিংসা ও সংঘাত। মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার আদর্শ—এমন প্রার্থনাই এখন সর্বস্তরের ভক্তদের।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

আদ্যাশক্তি মহামায়ার মর্ত্যে শুভ আগমন

Update Time : ১০:২২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

মিলন বৈদ্য শুভ, প্রতিবেদক

আকাশে-বাতাসে এখন শারদীয়ার আগমনী সুর। শিউলি ফুলের সুবাস আর কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। মহালয়ার পুণ্যতিথিতে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোকে আবাহন ঘটছে আদ্যাশক্তি মহামায়ার।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে এরই মধ্যে ভক্তদের মাঝে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। তবে দেবী দুর্গার আগমন শুধু আনন্দ-উৎসবের উপলক্ষ নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি-সম্প্রীতির এক চিরন্তন প্রতীক।

দশভূজা রূপে দেবীর আবির্ভাব
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, প্রাচীনকালে মহিষাসুর নামের এক প্রবল পরাক্রমশালী অসুরের অত্যাচারে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—তিন লোক অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। কঠোর তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর লাভ করে মহিষাসুর নিজেকে প্রায় অজেয় করে তোলে। তার অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন।
দেবতাদের সম্মিলিত তেজ ও শক্তি থেকে সৃষ্টি হয় এক জ্যোতির্ময়ী দেবীমূর্তি।
তিনিই দেবী দুর্গা বা আদ্যাশক্তি মহামায়া। দেবতারা তাঁদের শক্তিশালী অস্ত্র দেবীর হাতে তুলে দেন। ভগবান শিব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দেন সুদর্শন চক্র, ইন্দ্র দেন বজ্র, বায়ুদেব দেন ধনুকসহ বিভিন্ন দেবতা তাঁদের ঐশ্বরিক অস্ত্র প্রদান করেন। পর্বতরাজ হিমালয় দেবীকে দেন সিংহ বাহন।
দশ হাতে দশ অস্ত্র ধারণ করে দেবী হয়ে ওঠেন অজেয় দশভূজা।
মহিষাসুরের সঙ্গে মহাযুদ্ধ
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, সিংহের পিঠে আরোহণ করে দেবী দুর্গা মহিষাসুরের বিরুদ্ধে ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ নয় দিনের এই যুদ্ধে মহিষাসুর বারবার বিভিন্ন রূপ ধারণ করে দেবীকে পরাস্ত করার চেষ্টা করে।
অবশেষে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত ও বধ করেন। অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরের পতনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য ও ন্যায়ের জয়। এ কারণেই দেবী দুর্গা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে সমধিক পরিচিত।

দেবীর এই বিজয় শুধু পৌরাণিক একটি ঘটনা নয়; যুগে যুগে অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবেও তা বিবেচিত হয়ে আসছে।
অন্তরের অশুভ শক্তি দমনের শিক্ষা
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন। মহিষাসুরকে মানুষের অন্তরের বিভিন্ন অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। অহংকার, লোভ, কাম, ক্রোধ, মোহ ও স্বার্থপরতার মতো প্রবৃত্তি মানুষের বিবেক ও মানবিকতাকে আচ্ছন্ন করে।

দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্য তাই কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের ভেতরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়াও এই উৎসবের অন্যতম শিক্ষা।
নারী শক্তির জাগরণের প্রতীক
দেবী দুর্গার দশভূজা রূপ নারী শক্তির জাগরণ ও সামর্থ্যেরও এক অনন্য প্রতীক। দেবীর মধ্যে শক্তি, সাহস, প্রজ্ঞা, মমতা ও করুণার যে সমন্বয় দেখা যায়, তা সমাজে নারীর মর্যাদা ও শক্তির এক গভীর বার্তা বহন করে।

অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভালোবাসা, মমতা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিও নারীর মধ্যে রয়েছে—দেবী দুর্গার আরাধনা সেই চেতনাকেই ধারণ করে।

শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার আহ্বান
দশ হাতে অস্ত্র ধারণ করলেও দেবী দুর্গার মুখাবয়বে ফুটে ওঠে মমতা ও করুণার প্রতিচ্ছবি। তাঁর আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা কামনা করেন সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায়, অশান্তি ও সংঘাত দূর হোক।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে গড়ে উঠুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি—দুর্গোৎসবের আনন্দ যেন সেই মানবিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে, এমন প্রত্যাশাই ভক্তদের।

আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের মহোৎসব
দুর্গাপূজা তাই শুধু প্রতিমা আরাধনার উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও কল্যাণবোধ জাগ্রত করারও এক মহোৎসব। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা মানুষের অন্তর থেকে অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীকী আহ্বান জানায়।

আদ্যাশক্তি মহামায়ার শুভ আগমনে পৃথিবী থেকে দূর হোক রোগ-শোক, অশান্তি, হিংসা ও সংঘাত। মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার আদর্শ—এমন প্রার্থনাই এখন সর্বস্তরের ভক্তদের।