ঢাকা ১০:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লেমুয়ায় টেন্ডার ছাড়াই উধাও ৩০ লাখ টাকার সরকারি গাছ—প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৭:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৫৯ Time View
Print

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার ফেনীঃ

ফেনী সদর উপজেলার ৯নং লেমুয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সরকারি গাছ টেন্ডার ছাড়াই কেটে নেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে এসব গাছ নিধন করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রংধনু ক্লাব’-এর সভাপতি শামছু উদ্দিন চৌধুরী মানিক জানান, ২০০৩ সালে সংগঠনের উদ্যোগে লেমুয়া স্টীল ব্রিজ (নতুন ব্রিজ) সংলগ্ন এলাকা থেকে লেমুয়া মা ও শিশু হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে গাছগুলো লাগানো হয়। দীর্ঘ সময়ের পরিচর্যায় এসব গাছ বড় হয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছিল।
সম্প্রতি লেমুয়া ব্রিজ থেকে ধলিয়া ইউনিয়নের মমতাজ মিয়ার হাট পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধনের পরপরই কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রংধনু ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে গাছগুলো লাগিয়েছি। এখন কিছু ব্যক্তি এগুলো নিজেদের মালিকানা দাবি করে কেটে নিচ্ছে—এটা চরম অন্যায়।”
অন্যদিকে লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম মিয়াজি বলেন,
“গাছগুলো ব্যক্তি মালিকানার দাবি করা হচ্ছে বলে শুনেছি। তবে টেন্ডার ছাড়াই কাটা হয়েছে—এটি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”
লেমুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নান্টু কুমার দাস জানান,
“গাছগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের জমিতে ছিল। আমাদের কোনো পূর্ব অবহিত করা হয়নি। অফিসে এসে দেখি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।”
এদিকে বন বিভাগ, সড়ক বিভাগ ও এলজিইডি—কোনো দপ্তরেই এ বিষয়ে টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফেনী সদর উপজেলা সামাজিক বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র ভৌমিক বলেন,
“আমাদের দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি।”
লেমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান,
“কারা গাছ কেটেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সদর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী দ্বীপ্ত দাস গুপ্ত বলেন,
“আমাদের কাছে টেন্ডারের কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিচালকও নিশ্চিত করেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের জমির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, তবে কোনো দপ্তর থেকে অনুমোদন বা টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়দের দাবি:
এলাকাবাসী দ্রুত নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উপসংহার:
লেমুয়ায় এই গাছ নিধনের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এখন সবার নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

লেমুয়ায় টেন্ডার ছাড়াই উধাও ৩০ লাখ টাকার সরকারি গাছ—প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

Update Time : ০৭:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
Print

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার ফেনীঃ

ফেনী সদর উপজেলার ৯নং লেমুয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সরকারি গাছ টেন্ডার ছাড়াই কেটে নেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে এসব গাছ নিধন করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রংধনু ক্লাব’-এর সভাপতি শামছু উদ্দিন চৌধুরী মানিক জানান, ২০০৩ সালে সংগঠনের উদ্যোগে লেমুয়া স্টীল ব্রিজ (নতুন ব্রিজ) সংলগ্ন এলাকা থেকে লেমুয়া মা ও শিশু হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে গাছগুলো লাগানো হয়। দীর্ঘ সময়ের পরিচর্যায় এসব গাছ বড় হয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছিল।
সম্প্রতি লেমুয়া ব্রিজ থেকে ধলিয়া ইউনিয়নের মমতাজ মিয়ার হাট পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধনের পরপরই কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রংধনু ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে গাছগুলো লাগিয়েছি। এখন কিছু ব্যক্তি এগুলো নিজেদের মালিকানা দাবি করে কেটে নিচ্ছে—এটা চরম অন্যায়।”
অন্যদিকে লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম মিয়াজি বলেন,
“গাছগুলো ব্যক্তি মালিকানার দাবি করা হচ্ছে বলে শুনেছি। তবে টেন্ডার ছাড়াই কাটা হয়েছে—এটি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”
লেমুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নান্টু কুমার দাস জানান,
“গাছগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের জমিতে ছিল। আমাদের কোনো পূর্ব অবহিত করা হয়নি। অফিসে এসে দেখি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।”
এদিকে বন বিভাগ, সড়ক বিভাগ ও এলজিইডি—কোনো দপ্তরেই এ বিষয়ে টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফেনী সদর উপজেলা সামাজিক বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র ভৌমিক বলেন,
“আমাদের দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি।”
লেমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান,
“কারা গাছ কেটেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সদর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী দ্বীপ্ত দাস গুপ্ত বলেন,
“আমাদের কাছে টেন্ডারের কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিচালকও নিশ্চিত করেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের জমির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, তবে কোনো দপ্তর থেকে অনুমোদন বা টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়দের দাবি:
এলাকাবাসী দ্রুত নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উপসংহার:
লেমুয়ায় এই গাছ নিধনের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এখন সবার নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে।