লেমুয়া ইউনিয়নে বিগত সময়ে নির্যাতন, গায়েবি মামলা ও আতঙ্কের রাজত্বের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১১:৩৫:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬ ৮৪ বার পড়া হয়েছে

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার ফেনীঃ
ফেনী সদর উপজেলার ৯ নম্বর লেমুয়া ইউনিয়নে বিগত সরকারের সময় বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা, গ্রেফতার, জেল-জুলুম এবং বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব ঘটনার স্মৃতি এখনও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের মনে গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় সভাপতি মোশারফ হোসেন নাসিমের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী চক্র পুরো ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নুরুল আমিন ও যুবলীগ নেতা শংকর শীল সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কখন মামলা দেওয়া হবে, কাকে গ্রেফতার করা হবে কিংবা কার বাড়িতে অভিযান চালানো হবে—এসব বিষয়ে তারা তালিকা প্রস্তুত করে প্রশাসনের কাছে সরবরাহ করতেন।
বিশেষ করে যুবলীগ নেতা শংকর শীলকে কেন্দ্র করে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর মতে, তিনি জেলার প্রভাবশালী আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধেও অনেককে মিথ্যা মামলায় জড়াতেন। সামান্য মনোমালিন্য হলেও মারধর, হামলা কিংবা মামলার মুখোমুখি হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ইউনিয়নজুড়ে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক বিরাজ করত।
২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে লেমুয়া ইউনিয়নের ভাঙ্গার তাকিয়া এলাকায় একটি অবস্থান গড়ে তোলা হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। সেখানে নিয়মিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া হতো এবং ফেনীতে যাতায়াতকারী বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের আটক করে মারধর শেষে পুলিশে সোপর্দ করা হতো। এতে বহু নিরীহ সমর্থক শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যার পর ইউনিয়নে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হতো। কাউকে না পেলে তার ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হতো। এসব অভিযানে শংকর শীল, পঙ্কজ, আজাদ, দাউদ, সমীরসহ আরও কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, শংকর শীলের কাছে একটি শটগান ও কখনো ছোট পিস্তল দেখা গেছে। অনেকের মতে, এসব অস্ত্র তৎকালীন চেয়ারম্যানের ছিল, যা বর্তমানে তার কাছেই রয়েছে। ৫ আগস্টের পর চেয়ারম্যান এলাকা ত্যাগ করলেও অস্ত্রগুলো এখনও উদ্ধার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব অস্ত্র যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনাতেও শংকর শীলের সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই ঘটনায় তাকে অস্ত্রসহ দেখা গেছে।
অন্যদিকে, শংকর শীলের ছোট ভাই দীপঙ্কর শীলকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রথমে ফেনী পৌরসভায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি পান। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে পুনরায় চাকরিতে বহাল হন। এমনকি তিনি ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলাল উদ্দিন আলালের সুপারিশের কথা প্রচার করছেন বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এ দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, গত ১৭ থেকে ১৮ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে দীপঙ্কর শীলকে কখনো বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি তিনি সত্যিই বিএনপির কর্মী হয়ে থাকেন, তাহলে তার ভাইয়ের মাধ্যমে সংঘটিত নির্যাতনের সময় তিনি কেন প্রতিবাদ করেননি।
এ বিষয়ে লেমুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি ফেরদৌস কোরাইশি, সাবেক যুবদল নেতা নিজাম উদ্দিন, সাবেক কৃষক দল নেতা মহিউদ্দিন এবং বর্তমান কৃষক দল সভাপতি সুজল হকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বিশেষভাবে শংকর শীলের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটতে পারে, যা এলাকার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

























