ঢাকা ০৫:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

কদম ফুল ও আমার বাল্য স্মৃতি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই ২০২৫ ১২৯ বার পড়া হয়েছে

ফারহানা রাজ, এম.এ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)

কদম ফুল দেখলেই আজও এক মিষ্টি ঘ্রাণ মনে ভেসে আসে। মনে হয় যেন কোথাও কিছু হারিয়ে গেছে, অথচ এখনো তা বুকের ভিতর ধরা আছে—একটা হালকা বিরহের টান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শৈশবের মায়ামাখা দিনগুলো।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়, আমাদের স্কুল থেকে কয়েক গজ দূরে, দিঘীরপাড় বাজারের রাস্তার ধারে ছিল এক কদম গাছ। প্রতিদিন ছেলেমেয়েরা সেখান থেকে কদম ফুল পেড়ে আনতো। আমিও তাদের কাছ থেকে দু-একটা ফুল সংগ্রহ করে বইয়ের ডাটায় রেখে দিতাম। ফুলগুলোর গায়ে যেন কোনো দাগ না লাগে, সেজন্য খুব যত্ন করে বেঞ্চের বাইরে বের করে সাজিয়ে রাখতাম।

কিন্তু দুষ্টু বন্ধু-বান্ধবীদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল কদম ফুলকে ‘টাকলা’ করা! কদমের সাদা-হলুদ অংশ আলাদা করে তারা হাসত, খেলা করত। আমি তখন পড়ার টেবিলের এক কোণে রাখা জলগ্লাসে ফুল রেখে দিতে চাইলেও, সে পর্যন্ত ফুল পৌঁছাতো না। তার আগেই সেটা ‘টাকলা’ হয়ে যেত। এ নিয়ে কত হেসেছি, কেঁদেছি, আবার পিছু নিয়ে বলেছি—”একটা সুন্দর ফুল দে না রে!” কেউ কেউ দিতো, কিন্তু ফল এক—ফুল কখনো ঘরে পৌঁছাতো না।

আমার ফুফুর বাড়ি পাশের গ্রাম বসন্তপুরে। প্রায় ২ কিলোমিটার পথ—মাঠের আইল, ঝিরির খাল আর গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে যেতে হতো। সেখানে ফুফুর পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক কদম গাছ। তার নিচে ছিল হাজার হাজার কদম চারা। বর্ষা এলেই আমি হাতে কদম ফুল আর চারা নিয়ে হাঁটতাম বাড়ির দিকে। হাত ভরে যেতো কালচে দাগে, চারা লাগানোর আনন্দে।

চারা গাছগুলো উঠানে লাগাতে গেলেই মা আর দাদু বলতেন—
“কদম গাছ উঠানে লাগানো যায় নাকি? যাও বোকা মেয়ে, ঝোপ-জঙ্গলের ধারে লাগাও।”

আমি নিরুত্তরে চলে যেতাম বাড়ির পেছনের ভেজা, আগাছায় ভরা জায়গায়। যত্ন করে লাগাতাম, কিন্তু দু-একদিনের মাথায় গাছগুলো পচে যেতো। হিসেব নেই, কতবার যে এনেছি, লাগিয়েছি, আবার হারিয়েছি।

একবার একটি চারা বেঁচে গেলো। প্রায় এক বছর বেড়ে উঠছিল। হঠাৎ আব্বু বাগানের কিছু গাছ বিক্রি করলেন। কাঠুরে এসে এক বড় গাছ কাটার সময় আমার কদম চারার ওপর ফেলে দেয়। গাছটি মাটিতে লেপ্টে যায়, আর উঠে দাঁড়ায় না।

এরপর আমি বড় হয়েছি, কদম ফুলের প্রতি মায়া থাকলেও গাছ লাগানোর চেষ্টা আর করিনি। আজ আমি ২৭ বছর বয়সী, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন। এই সময়ের মধ্যে আব্বু বাড়ির পেছনের বাগান পরিষ্কার করে কাঁটাতারের ঘের দিয়ে লাগিয়েছেন আম, লিচু, মাল্টা, লটকন, আমলকি, মেহেদি, সিডলেস লেবু ইত্যাদি।

ঠিক সেই বাগানের ফাঁকা জায়গায়, একদিন একটি পাখি হয়তো কদম ফল খেয়ে ফেলে দিয়েছিলো, সেখানেই জন্ম নেয় একটি কদম চারা। কেমন করে যেন একদিন সেই চারাটি নজরে এলো—তখন সেটি প্রায় মানুষের সমান উচ্চতার। আব্বু বললেন,
“এটা কেটে দাও, না হলে অন্য গাছগুলো রোদ পাবে না।”

কিন্তু আমরা কেউই তাকে কাটতে পারলাম না। চারাটি দিনে দিনে বড় হতে লাগলো, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করলো, অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গেলো। গত বর্ষায় কয়েকটি ফুলও ধরেছিলো। এবার ঈদের পর বাবার বাড়ি গিয়ে দেখি, সেই কদম গাছ এখন নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। শাখা-প্রশাখায় ভরে উঠেছে সোনালি স্মৃতির ছায়ায়।

আজও কদম ফুল দেখলে আমার শৈশব, হাসি-কান্না, ব্যর্থ চেষ্টা আর সেই নিষ্পাপ ভালোবাসার দিনগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
একটা গাছ—একটা ফুল—আর একটি জীবন কাহিনি, সব মিলে আমার কদম ফুলের গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দৈনিক বাংলাদেশের চিত্র একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। এই পত্রিকার মূল স্লোগান হলো "সত্য প্রকাশে আপোষহীন"।আমরা এ দেশের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের কথা বলি।একজন অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়ে অন্যায় প্রতিরোধে সাহায্য করতে আমরা সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।দৈনিক বাংলাদেশের চিত্র পত্রিকা গনমানুষের কথা বলে।
ট্যাগস :

কদম ফুল ও আমার বাল্য স্মৃতি

আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই ২০২৫

ফারহানা রাজ, এম.এ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)

কদম ফুল দেখলেই আজও এক মিষ্টি ঘ্রাণ মনে ভেসে আসে। মনে হয় যেন কোথাও কিছু হারিয়ে গেছে, অথচ এখনো তা বুকের ভিতর ধরা আছে—একটা হালকা বিরহের টান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শৈশবের মায়ামাখা দিনগুলো।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়, আমাদের স্কুল থেকে কয়েক গজ দূরে, দিঘীরপাড় বাজারের রাস্তার ধারে ছিল এক কদম গাছ। প্রতিদিন ছেলেমেয়েরা সেখান থেকে কদম ফুল পেড়ে আনতো। আমিও তাদের কাছ থেকে দু-একটা ফুল সংগ্রহ করে বইয়ের ডাটায় রেখে দিতাম। ফুলগুলোর গায়ে যেন কোনো দাগ না লাগে, সেজন্য খুব যত্ন করে বেঞ্চের বাইরে বের করে সাজিয়ে রাখতাম।

কিন্তু দুষ্টু বন্ধু-বান্ধবীদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল কদম ফুলকে ‘টাকলা’ করা! কদমের সাদা-হলুদ অংশ আলাদা করে তারা হাসত, খেলা করত। আমি তখন পড়ার টেবিলের এক কোণে রাখা জলগ্লাসে ফুল রেখে দিতে চাইলেও, সে পর্যন্ত ফুল পৌঁছাতো না। তার আগেই সেটা ‘টাকলা’ হয়ে যেত। এ নিয়ে কত হেসেছি, কেঁদেছি, আবার পিছু নিয়ে বলেছি—”একটা সুন্দর ফুল দে না রে!” কেউ কেউ দিতো, কিন্তু ফল এক—ফুল কখনো ঘরে পৌঁছাতো না।

আমার ফুফুর বাড়ি পাশের গ্রাম বসন্তপুরে। প্রায় ২ কিলোমিটার পথ—মাঠের আইল, ঝিরির খাল আর গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে যেতে হতো। সেখানে ফুফুর পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক কদম গাছ। তার নিচে ছিল হাজার হাজার কদম চারা। বর্ষা এলেই আমি হাতে কদম ফুল আর চারা নিয়ে হাঁটতাম বাড়ির দিকে। হাত ভরে যেতো কালচে দাগে, চারা লাগানোর আনন্দে।

চারা গাছগুলো উঠানে লাগাতে গেলেই মা আর দাদু বলতেন—
“কদম গাছ উঠানে লাগানো যায় নাকি? যাও বোকা মেয়ে, ঝোপ-জঙ্গলের ধারে লাগাও।”

আমি নিরুত্তরে চলে যেতাম বাড়ির পেছনের ভেজা, আগাছায় ভরা জায়গায়। যত্ন করে লাগাতাম, কিন্তু দু-একদিনের মাথায় গাছগুলো পচে যেতো। হিসেব নেই, কতবার যে এনেছি, লাগিয়েছি, আবার হারিয়েছি।

একবার একটি চারা বেঁচে গেলো। প্রায় এক বছর বেড়ে উঠছিল। হঠাৎ আব্বু বাগানের কিছু গাছ বিক্রি করলেন। কাঠুরে এসে এক বড় গাছ কাটার সময় আমার কদম চারার ওপর ফেলে দেয়। গাছটি মাটিতে লেপ্টে যায়, আর উঠে দাঁড়ায় না।

এরপর আমি বড় হয়েছি, কদম ফুলের প্রতি মায়া থাকলেও গাছ লাগানোর চেষ্টা আর করিনি। আজ আমি ২৭ বছর বয়সী, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন। এই সময়ের মধ্যে আব্বু বাড়ির পেছনের বাগান পরিষ্কার করে কাঁটাতারের ঘের দিয়ে লাগিয়েছেন আম, লিচু, মাল্টা, লটকন, আমলকি, মেহেদি, সিডলেস লেবু ইত্যাদি।

ঠিক সেই বাগানের ফাঁকা জায়গায়, একদিন একটি পাখি হয়তো কদম ফল খেয়ে ফেলে দিয়েছিলো, সেখানেই জন্ম নেয় একটি কদম চারা। কেমন করে যেন একদিন সেই চারাটি নজরে এলো—তখন সেটি প্রায় মানুষের সমান উচ্চতার। আব্বু বললেন,
“এটা কেটে দাও, না হলে অন্য গাছগুলো রোদ পাবে না।”

কিন্তু আমরা কেউই তাকে কাটতে পারলাম না। চারাটি দিনে দিনে বড় হতে লাগলো, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করলো, অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গেলো। গত বর্ষায় কয়েকটি ফুলও ধরেছিলো। এবার ঈদের পর বাবার বাড়ি গিয়ে দেখি, সেই কদম গাছ এখন নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। শাখা-প্রশাখায় ভরে উঠেছে সোনালি স্মৃতির ছায়ায়।

আজও কদম ফুল দেখলে আমার শৈশব, হাসি-কান্না, ব্যর্থ চেষ্টা আর সেই নিষ্পাপ ভালোবাসার দিনগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
একটা গাছ—একটা ফুল—আর একটি জীবন কাহিনি, সব মিলে আমার কদম ফুলের গল্প।