
মোঃ আতিকুর রহমান;কোন ভূখন্ডের ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা সে অঞ্চলের তাদের অবদানের কারণে সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন, একেকটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। তাঁরা কেবল ব্যক্তি নন, তাঁরা একটি আদর্শ, একটি দর্শন এবং একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন, সংগ্রাম, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন আজও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি এবং প্রেরণার উৎস।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়ে যখন সমগ্র জাতি অনিশ্চয়তা ও দিকনির্দেশনার সংকটে নিমজ্জিত, তখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী জনতার মনে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের অদম্য শক্তি সঞ্চার করেছিল। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে তিনি সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একজন পেশাদার সৈনিকের দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তবে শহীদ জিয়ার গুরুত্ব কেবল মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথায় সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাতীয় স্বার্থকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন।
শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নকে নতুন মাত্রা প্রদান করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যে জাতি নিজের পরিচয় ও ঐতিহ্যের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না, সে জাতি কখনো বিশ্বসভায় মর্যাদার আসন অর্জন করতে পারে না। তাই তিনি জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বাস্তববাদী নেতৃত্ব। তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং জনগণের কল্যাণ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে যে কর্মসূচিগুলো গৃহীত হয়েছিল, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বিশেষত কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা ছিল যুগান্তকারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে গ্রামের মানুষের মধ্যে। কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, খাল খনন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
এই প্রসঙ্গে শহীদ জিয়ার বহুল আলোচিত একটি উক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—“I Will Make Politics Difficult।” অনেকেই এই বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ নিয়ে বিভ্রান্ত হন। প্রকৃতপক্ষে তিনি রাজনীতিকে জটিল করতে চাননি; তিনি রাজনীতিকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর “Back to the Village” দর্শনের মূল কথা ছিল, রাজনীতিবিদদের রাজধানীকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় ছেড়ে গ্রামে-গঞ্জে, মানুষের কাছে, বাস্তব জীবনের সমস্যার কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত গণমানুষের আস্থা হারায়। তাই তিনি তথাকথিত ‘প্রাসাদ রাজনীতির’ পরিবর্তে জনমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।
শহীদ জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনেও সততা, শৃঙ্খলা এবং কর্মনিষ্ঠার অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জবাবদিহিতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ। তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এই মূল্যবোধের সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। আজ যখন রাজনীতিতে নৈতিকতার সংকট এবং জনআস্থার প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, তখন শহীদ জিয়ার জীবনাদর্শ নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি ছিলেন দূরদর্শী। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ তাঁকে একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজকের বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা, আত্মনির্ভরতার দর্শন, জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক নীতি এবং জনগণনির্ভর রাজনৈতিক চেতনা নতুন তাৎপর্য বহন করে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকট, সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অভিযাত্রায় তাঁর আদর্শ আমাদের জন্য পথনির্দেশক হতে পারে।
জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, বহুদলীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, জনগণের ভোটাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও কার্যকর করে তোলার মাধ্যমে আমরা তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারি। এজন্য প্রয়োজন ইস্পাতদৃঢ় জাতীয় ঐক্য, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত নেতৃত্ব।
শহীদ জিয়াউর রহমান তাই কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জাতীয় মর্যাদার এক স্থায়ী প্রতীক। তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম, রাষ্ট্রচিন্তা এবং কর্মপ্রেরণা জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য আজও এক অম্লান আলোকবর্তিকা। সময়ের প্রবাহে ব্যক্তি বিলীন হতে পারেন, কিন্তু আদর্শ কখনো বিলীন হয় না। শহীদ জিয়ার আদর্শও তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবে।
কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল
শিক্ষার্থী, মাস্টার্স (২য় সেমিস্টার), ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।