
সেলিম চৌধুরী
জেলা প্রতিনিধি, রংপুরঃ
বৃহত্তর রংপুর জেলার কুড়িগ্রামের কচাকাটা থানার ছনবান্দা খালিশাকুড়ি এলাকায় পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যার উদ্দেশ্যে বিষাক্ত ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ পুলিশের এক সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মোছাঃ হালিমা খাতুন (৩৫) কুড়িগ্রামের বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।
আদালতে দাখিল করা অভিযোগ ও হলফনামা থেকে জানা যায়, হালিমা খাতুনের সঙ্গে অভিযুক্ত মোঃ আশরাফুল আলম (৩৬)-এর গত ৬ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। অভিযোগপত্রে বিয়েতে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর নির্ধারণের কথা উল্লেখ রয়েছে। বিয়ের পর আশরাফুল তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার শুরু করেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
হালিমার অভিযোগ, সংসার চলাকালে অভিযুক্তরা তার কাছে বিভিন্ন সময় ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং সেই টাকা তার বাবার কাছ থেকে এনে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। যৌতুকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
যেভাবে নির্যাতনের অভিযোগ
আদালতে দেওয়া অভিযোগে হালিমা খাতুন দাবি করেন, গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ রাতে আনুমানিক ৮টার দিকে পুনরায় তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। তিনি যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিবাদ করলে অভিযুক্ত আশরাফুল উঠানে থাকা একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মারধরের একপর্যায়ে হালিমা মাটিতে পড়ে গেলে অপর দুই অভিযুক্ত তার মুখ চেপে ধরেন এবং প্রথম অভিযুক্ত তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক বিষাক্ত ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
পরে তার গোঙানির শব্দ ও অভিযুক্তদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর একটি অটোরিকশাযোগে রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে তাকে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। অভিযোগপত্রে হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্ট্রেশন নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে।
হালিমার দাবি, হাসপাতালে তার বাবা-মা গিয়ে তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান এবং তাদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন।
আপসের চেষ্টা ব্যর্থ, আদালতে মামলা
অভিযোগকারী আরও জানান, চিকিৎসা শেষে তিনি স্বামীর সঙ্গে সংসার করার চেষ্টা করেন এবং বিষয়টি মীমাংসার জন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে আপসের উদ্যোগ নেন। তবে অভিযুক্তদের অসহযোগিতার কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে কচাকাটা থানায় মামলা করতে গেলে মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়—এমন দাবি করে তিনি কুড়িগ্রামের বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন।
আদালতে দাখিল করা হলফনামায় হালিমা খাতুন নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং হলফনামা সম্পাদনে আইনগতভাবে সক্ষম বলে ঘোষণা করেছেন। একই হলফনামায় তিনি মামলার অভিযোগগুলোর বিষয়ে শপথপূর্বক বক্তব্য দিয়েছেন।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
অভিযোগকারী হালিমা খাতুনের দাবি, অভিযুক্ত আশরাফুল আলম বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য এবং আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার BP নম্বর BP9111142009। তিনি বর্তমানে পুলিশের বেতার এর রংপুর রেঞ্জের অধীনে রংপুর এ কর্মরত বলে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ অবস্থায় একজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে চলমান মামলার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন হালিমা।
তিনি বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের কাছে তার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হালিমা খাতুনের ভাষ্য, তিনি প্রতিশোধ নয়—আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার চান।
তবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য ও অপর অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। আদালতে মামলাটি চলমান থাকায় অভিযোগগুলো এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়। আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
বিষয়ে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের পুলিশের এসিস্ট্যান্ট টেলিকম অফিসার ও টেলিকম এর ওসি সফিকুল ইসলাম এর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।