
আবু তালেব,স্টাফ রিপোর্টার নারায়ণগঞ্জঃ
একসময়ের ঐতিহ্যবাহী শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জ এখন ক্রমেই মাদকের নিরাপদ রুট ও বড় বাজারে পরিণত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, সংঘবদ্ধ চক্রের দৌরাত্ম্য এবং কিশোর-তরুণদের মাঝে মাদকাসক্তির আশঙ্কাজনক বিস্তার সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক নজরদারির কিছুটা শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মাদক চক্রগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাগুলোতেও ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের অবাধ বেচাকেনা চলছে।
ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। ঢাকার সাথে সহজ যোগাযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, নৌপথ এবং চারপাশের জেলার সংযোগস্থল হওয়ায় সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সহজেই এখানে মাদক পরিবহন ও সরবরাহ করতে পারছে। অতীতে যেসব স্থানে গোপনে মাদক লেনদেন হতো, তার অনেকগুলোই এখন প্রকাশ্য স্পটে পরিণত হয়েছে।
র্যাবের ওপর সশস্ত্র হামলা ও বিশাল উদ্ধার অভিযান:
গত ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে ধরতে গিয়ে র্যাব-১১ এর সদস্যরা সশস্ত্র হামলার শিকার হন। এতে ৩ জন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে চালানো বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, সিসি ক্যামেরা, একটি ড্রোন, ২৩৫ কেজি গাঁজা এবং ১১ হাজার পিস ইয়াবাসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে মাদক চক্রগুলো কতটা সুসংগঠিত।
শহরের শীর্ষ ২০টি মাদক স্পট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্তত ২০টি এলাকায় নিয়মিত মাদকের কারবার চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো:
• চাষাঢ়া ও ২ নম্বর রেলস্টেশন
• গলাচিপা-উকিলপাড়া রেললাইন
• জামতলা ও মন্ডলপাড়া পুল
• জিমখানা বস্তি ও আমলাপাড়া
• মাসদাইর, ইসদাইর ও বাবুরাইল
• দেওভোগ, জল্লারপাড়া ও পাইকপাড়া
• কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এবং নিতাইগঞ্জ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা বাড়ে এবং গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক কেনাবেচা। এর প্রতিবাদ করতে গেলে সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।
বাড়ছে সামাজিক অপরাধ, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, শহরে চুরি, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে মাদকাসক্তি সরাসরি জড়িত। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই অনেক তরুণ অপরাধের পথ বেছে নিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কৌতূহল বা বন্ধুদের প্রভাবে মাদক গ্রহণ শুরু করে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশিষ্টজনদের বক্তব্য ও সমাধানের পথ
• রফিউর রাব্বি (আহ্বায়ক, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলন): “রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ই দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও পুরোনো চক্রের জায়গায় নতুন চক্র তৈরি হয়। মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতা থাকায় গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।”
• অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম (সাবেক সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব): “প্রশাসনের আন্তরিকতা থাকলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব নয়। শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, বরং এর পেছনে থাকা গডফাদার ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং প্রশাসনের ভেতরের দুর্বলতা দূর করতে হবে।”
সামাজিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
১. নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি এবং মাদক কারবারিদের অর্থের উৎস সন্ধান।
২. সীমান্ত ও পরিবহন ব্যবস্থায় কঠোর কড়াকড়ি।
৩. গ্রেপ্তারকৃতদের দ্রুত জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানো ঠেকাতে কার্যকর আইনি প্রক্রিয়া।
৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
শিল্প ও ব্যবসাসমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় এই সংকট পুরো জননিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।