
রাসেল হোসেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-
ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল মোড়ে ঝুকিপূর্ণ স্থানে গড়ে ওঠা এবং বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত অবয়বের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এক অসমাপ্ত ভাস্কর্য অপসারণকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে একটি বিশেষ মহলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনগণ কিংবা কোনো বড় রাজনৈতিক দল এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা না করলেও ঢাকা থেকে আসা নাগরিক সমাজের একটি অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকরা বিষয়টিকে ঘিরে ঝিনাইদহকে নতুন করে উত্তপ্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের চত্বরটি নিরাপদ রেখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত অবয়বের ভাস্কর্য উপযুক্ত স্থানে সম্মানজনকভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে। জেলা প্রশাসনের এই ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ঢাকা থেকে আসা ‘নাগরিক সমাজের’ প্রতিনিধি পরিচয়ধারী একটি দল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাস্কর্যস্থলে মানববন্ধন এবং বিকেলে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনাটিকে অন্যদিকে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, মানবাধিকার কর্মী দীপন খীসা, গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফারহা তানজীম তিতিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান দাবি করেন, ওই স্থানেই বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য রাখতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “যারা ভাস্কর্য ভাঙচুরের সাথে জড়িত, তারা স্পষ্টতই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি। স্বাধীনতার এত বছর পরও জাতীয় বীরদের ওপর এমন আঘাত কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত বড় একটি ঘটনার পরও প্রশাসন এখন পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমরা অবিলম্বে এই অপকর্মের সাথে জড়িত মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
ঝিনাইদহ সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড আব্দুল আলিম জানান, মূল বাস টার্মিনাল এলাকার মোড়ে অবস্থিত ওই উঁচু কাঠামোটির কারণে প্রতিদিন যানবাহন চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। একপাশের গাড়ি অন্যপাশ থেকে দেখা না যাওয়ায় সেখানে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনায় পড়ছিল যানবাহন ও পথচারীরা। এছাড়া অসমাপ্ত ওই চত্বরটি দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকায় তা মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল এবং চরম নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলন চলাকালেই স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নে ঢাকা থেকে আসা প্রতিনিধিদের এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে খোদ ঝিনাইদহের সংবাদকর্মীরা প্রশ্ন তোলেন। ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আসিফ কাজল ও চ্যানেল ২৪-এর জেলা প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন সরাসরি প্রশ্ন রেখে বলেন, “যে ভাস্কর্য নিয়ে আপনারা কথা বলছেন, সেটির অবয়ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সাথে মেলে না এবং স্থানীয়দের দাবির মুখেই এটি সরানো হচ্ছে। তাছাড়া রাস্তার মাঝখানে এটি থাকার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং চালকদের চলাচলে মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে। যে ভাস্কর্য ভাঙ্গাই হয়নি তা নিয়ে অহেতুক আন্দোলন কেন করা হচ্ছে?” সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে প্রতিনিধি দলের সদস্য সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাইদ জানান, তারা ভাস্কর্য্য ভাঙ্গার বিপক্ষে, সেটা যারই হোকনা কেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ জুলাই থেকে শহরের ওই মোড়ের চত্বর প্রসস্তকরণ ও বিকৃত কাঠামো অপসারণের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলে গত ১৮ জুলাই অপসারণ কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ মাস্টার এবং সাবেক কমান্ডার কামালুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে পূর্বে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো স্বীকৃত ভাস্কর্য ছিল বলে তাঁদের জানা ছিল না। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, বীরশ্রেষ্ঠের নামে কোনো স্থাপনা তৈরি করতে হলে তা যথাযথ সম্মান, সঠিক অবয়ব এবং নিরাপদ স্থানে হওয়া উচিত, যা বর্তমান জেলা প্রশাসন নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে, একটি মিমাংশিত ঘটনা নিয়ে পানি ঘোলা করা কাম্য নয়।
রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেনের সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস সত্ত্বেও ঢাকা থেকে এসে সংবাদ সম্মেলন ও ঝিনাইদহ ইস্যু তৈরি করার এই চেষ্টা মূলত দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে ঘোলাটে করার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ।