
বিজ্ঞান থেকে মানবিক—পথে হাজারো বাধা থাকলেও থামেনি মুনিয়ার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন পরিবার ও শিক্ষকদের
রাসেল হোসেন ঝিনাইদহ:অভাব অনটন যার নিত্যসঙ্গী, দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাতের যোগান দিতে যেখানে হিমশিম খেতে হয় দিনমজুর বাবাকে, সেখানে মেধা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে শত বাধাকে পেছনে ফেলে উচ্চমাধ্যমিকে সাফল্যের মুকুট পরেছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মুনিয়া খাতুন। প্রতিকূলতার সেই সিঁড়ি বেয়েই এখন তাঁর চোখ আরও উঁচুতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ভবিষ্যতে দেশের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়া।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রাম ইউনিয়নের দয়াপুর গ্রামের আবদুল মোতালেব ও শাহানাজ বেগমের তিন কন্যার মধ্যে দ্বিতীয় মুনিয়া। কালীগঞ্জ সরকারি মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করা এই মেধাবীর জীবনসংগ্রাম যেন হার মানায় যেকোনো উপন্যাসের গল্পকেও।
মুনিয়ার বাবা আবদুল মোতালেব দিনমজুর। অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে ৫ সদস্যের সংসার চালানোই যেখানে অসম্ভব, সেখানে তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাঁর সাধ্যের বাইরে ছিল। মা শাহানাজ বেগম জানান, তাঁদের নিজস্ব কোনো চাষযোগ্য জমি নেই; মাত্র দুই শতক জমির ওপর টিনের চালের ছোট্ট একটি ঘরে তাদের বসবাস।
তবে অভাবের তাড়নায় এই পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনার স্পৃহায় কখনো ভাটা পড়েনি। বাবা-মায়ের ভাষ্যমতে, তিন বোনই অসম্ভব মেধাবী। বড় বোন মনিরা খাতুন মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে চাকরির জন্য লড়ছেন। বড় বোনের টিউশনির জমানো সামান্য অর্থ এবং ছোট বোন তমা খাতুনের পড়াশোনার মাঝেই কোনোমতে টিকে ছিল মুনিয়ার শিক্ষা জীবন। এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর মুনিয়ার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু চরম আর্থিক সংকটের কারণে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ ধরে রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়েই তাঁকে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে হয়।
এসএসসি পাসের পর যখন উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে অন্ধকার দেখছিলেন মুনিয়া, ঠিক তখনই ‘মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট’-এর শিক্ষাবৃত্তি তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়। সেই বৃত্তির অর্থের ওপর ভর করেই তিনি এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
নিজের অতীত স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে মুনিয়া জানান, এসএসসির আগে প্রাইভেট পড়ার ফি সময়মতো পরিশোধ করতে না পেরে অনেক সময় মানসিক কষ্টে ভুগতেন। সেই লজ্জা এবং পারিবারিক অনটনের চাপ থেকেই তাঁকে বিভাগ পরিবর্তনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তবে আজ আর পেছনে ফিরে তাকাতে চান না তিনি। মুনিয়ার বর্তমান লক্ষ্য—উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করা।
মুনিয়ার শিক্ষাগুরু ও সরকারি মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আবদুর রহিম তাঁর সম্পর্কে বলেন, “মুনিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও মননশীল এক শিক্ষার্থী। আর্থিক অনটনের কারণে সে বিজ্ঞান বিভাগ ছাড়তে বাধ্য হলেও মানবিক বিভাগে থেকে প্রমাণ করেছে যে ইচ্ছে থাকলে মেধার বিকাশ ঠেকিয়ে রাখা যায় না। একটু সহযোগিতা পেলে সে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।”
দিনমজুর পিতার পক্ষে এই মেধাবী মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাই দেশের বিত্তবান, দাতা সংস্থা এবং মানবিক মানুষেরা যদি মুনিয়ার পাশে এসে দাঁড়ান, তবে হয়তো এই অদম্য তরুণী তার স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারবে। মুনিয়ার এই পথচলায় সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তাঁর শিক্ষক, পরিবার ও এলাকাবাসী।