
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া প্রকৃত যোদ্ধাদের তালিকা নতুন করে যাচাই-বাছাই করে প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আহত বা নিহত না হলেও গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেকেই তালিকাভুক্তির আবেদন করার সুযোগ পাননি। তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় তালিকা চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে অযোগ্য কেউ যাতে তালিকাভুক্ত হতে না পারেন এবং কোনো প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সদস্য যাতে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে জুলাইযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ, শহীদ ও আহতদের তালিকা প্রণয়নের নীতিমালা, আইন সংশোধন, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও আবাসনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে কমিটির সভাপতি মো. মনিরুল হক চৌধুরী প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের পক্ষ থেকেও সঠিক তালিকা প্রণয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আহত বা নিহত না হলেও যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের অনেকেই তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করার সুযোগ বা তথ্য পাননি।
নতুন করে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সভাপতি বলেন, ‘কীভাবে সঠিক ও নির্ভুলভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে জুলাইযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।’ তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও কমিটির সদস্য আহমেদ আযম খান বলেন, ‘জুলাইযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা আবেদন ও তালিকাভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই অবগত ছিলেন না। দেশব্যাপী ব্যাপক অনুরোধ আসায় মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও তালিকাভুক্তির কার্যক্রম উন্মুক্ত করেছে।’
তিনি কমিটির সভাপতি ও অন্য সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের শনাক্ত করতে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হতে না পারেন। অতীতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তিতে সংঘটিত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শুধু প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও সংসদের কাছে জবাবদিহি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী।
বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের জানান, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধের নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮৪৩টি শহীদ পরিবার ও ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের আর্থিক সহায়তা ও মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আহত জুলাইযোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আবাসন কার্যক্রমও চলছে।
পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তা এবং পুনর্বাসনের জন্য ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
জুলাইযোদ্ধা কারা, সংজ্ঞা নির্ধারণের দাবি
বৈঠকে কমিটির সদস্য মো. আবদুল হান্নান বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এবং জুলাইযোদ্ধা কারা এবং তাদের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে, তা সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। অতীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।