
যশোর জেলা প্রতিনিধি:
‘অপহরণ মামলায় আটক সুমনকে নিয়ে নতুন তথ্য’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক মারুফ হোসেন সুমনকে ঘিরে এবার সামনে এসেছে কথিত চাকরি বাণিজ্যের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ বাহিনী, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল একটি চক্র।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে উঠে এসেছে, এই চক্রের মূলহোতা শহরতলীর নুরপুর গ্রামের মোদাচ্ছের হোসেনের ছেলে কামরুল ইসলাম। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
গত ৬ মে চাঁদাবাজির অভিযোগে যশোর শহরের বারান্দী মোল্লাপাড়ার লাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন, তফসিডাঙ্গা গ্রামের মৃত আবুল কালামের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন এবং নাজির শংকরপুর এলাকার মৃত মতিয়ার রহমানের ছেলে মারুফ হোসেন সুমনকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। তদন্তের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে, সুমন শুধু চাঁদাবাজিতেই নয়, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি বড় সিন্ডিকেটের সঙ্গেও জড়িত।
সূত্র বলছে, কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি সক্রিয় চক্র রয়েছে। এদের মধ্যে মাগুরার আব্দুল জব্বার, মণিরামপুরের বুলি, নড়াইলের লিমন, আক্তার হোসেন, ফরহাদ আব্দুর রশিদ এবং অভয়নগরের আল-আমিনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চক্রের সদস্যরা কমিশনের ভিত্তিতে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহ করে কামরুল ইসলামের কাছে নিয়ে যেত। এরপর বিশেষ বাহিনী, পুলিশ কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হতো। টাকা নেওয়ার পর শুরু হতো সময়ক্ষেপণ, নানা অজুহাত এবং শেষে প্রতারণা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও কামরুল ইসলাম ভ্যানে করে বেকারির রুটি-পাউরুটি বিক্রি করতেন। পরে তিনি নিজেকে বিভিন্ন বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ দাবি করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।
গত বছরের ৫ এপ্রিল কেশবপুরের মজিদপুরের ভুক্তভোগী শ্যামল দাস এই কামরুল চক্রের চাকররি প্রতারণা ও ১৩ লাখ টাকার প্রতারণা ঘটনায় মণিরামপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নাম্বার ৮। ওই মামলায় জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি তদন্ত করে ১২ এপ্রিল আটক করে কামরুলকে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কামরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা চাকরি দেওয়ার নামে অনেকের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সংগ্রহ করতেন। পরবর্তীতে এসব কাগজ ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।’
তিনি আরও জানান, তদন্তে মনা ওরফে মনির, খসরু, বসিরসহ আরও কয়েকজন সক্রিয় সদস্যের তথ্য মিলেছে। পুরো চক্রের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একসময় আওয়ামী লীগের পরিচয়ে নুরপুর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন কামরুল ইসলাম। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ঝিনাইদহের বারোবাজারে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান নিয়ে নতুন করে সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে সাবেক ও চাকরিচ্যুত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকেও সঙ্গে নিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, কামরুল ও তার সহযোগীদের বাড়িতে অভিযান চালালে বিপুল পরিমাণ ফাঁকা স্ট্যাম্প, চেকের পাতা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি দেওয়ার পর কেউ অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেই স্ট্যাম্প ও চেক ব্যবহার করে মামলা, ভয়ভীতি ও হয়রানি করা হতো।