
বিশেষ প্রতিনিধি :যশোর সদর উপজেলার নুরপুর গ্রামের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব কামরুল ইসলামের অপরাধের ডালপালা এবার গড়িয়েছে বিশাল মাদকের চেইন ও আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ সিন্ডিকেটে। বিশেষ বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় চাকরি দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পর এবার তিনি মেতে উঠেছেন সীমান্তভিত্তিক মাদকের বড় বড় চালান সরবরাহে। সম্প্রতি নড়াইল জেলা পুলিশের হাতে তাঁর নিজস্ব প্রাইভেটকার থেকে ৫০ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ মাদক ‘এস্কাফ’ জব্দ এবং চালক আটক হলেও রহস্যজনকভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন এই সিন্ডিকেটের প্রধান কামরুল।
এদিকে, গ্রেপ্তারকৃত গাড়িচালক ইমরান হোসেনকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে চোখ কপালে ওঠার মতো সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাধারণ একজন প্রাইভেটকার চালক হয়েও তিনি মাদক কারবারের সুবাদে ইতিমধ্যেই ৪ থেকে ৫টি বিলাসবহুল গাড়ি ও একাধিক আলিশান বাড়ির মালিক বনে গেছেন। একজন ড্রাইভারের যদি এত কোটি টাকার অঢেল সম্পত্তি থাকে, তবে এই পুরো সিন্ডিকেটের মূল হোতা কামরুল ইসলাম প্রতারণা ও মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে কত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এখন তা নিয়ে সর্বমহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে কালনা-নড়াইল-যশোর মহাসড়কের মালিবাগ মোড় এলাকায় নড়াইল সদর থানা-পুলিশের একটি বিশেষ টিম নিয়মিত চেকপোস্ট বসায়। এ সময় নড়াইল থেকে লোহাগড়াগামী কামরুল ইসলামের একটি প্রাইভেটকারের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ সেটিকে থামায়। পরবর্তীতে সূক্ষ্ম তল্লাশি চালিয়ে গাড়িটির পেছনের ডিকিতে প্লাস্টিকের বস্তায় অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে লুকিয়ে রাখা ৫০ বোতল ভারতীয় এস্কাফ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকেই জব্দ করা হয় গাড়িটি এবং আটক করা হয় চালক ইমরান হোসেনকে (২৯)। আটক ইমরান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাদেডিহী গ্রামের শফিউল্লাহর ছেলে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আটক চালক ইমরান হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কামরুল ইসলামের হয়ে মাদকের চালান আনা-নেওয়ার কাজ করছিলেন। এই মাদক কারবারের কল্যাণে ইমরান এখন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক। তাঁর নামে-বেনামে ৪-৫টি গাড়ি এবং একাধিক দৃষ্টিনন্দন বাড়ি রয়েছে। সামান্য চালকের এই আংগুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার গল্প প্রমাণ করে, কামরুলের অপরাধ সিন্ডিকেট কতটা বিশাল ও শক্তিশালী। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ চালক ইমরান যদি মাদকের বাহক হয়েই এত সম্পদের পাহাড় গড়তে পারেন, তবে মূল মাস্টারমাইন্ড কামরুল ইসলাম চাকরি দেওয়ার নামে হাজারো মানুষের রক্ত পানি করা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং বিশাল মাদক সাম্রাজ্য চালিয়ে কত হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ তৈরি করেছেন?
অনুসন্ধানী সূত্র ও স্থানীয়দের দাবিমতে, বিশেষ বাহিনীতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কামরুল ইসলাম। প্রতারণার এসব ঘটনায় দেশের একাধিক থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি দৈনিক বাংলাদেশ মানচিত্র’- পত্রিকায় তাঁর এসব অপকর্মের খবর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে তিনি এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দেন।
আইনশৃঙ্খলার চোখ ফাঁকি দিতে তিনি প্রথমে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। তবে সূত্র বলছে, চাকরি দেওয়ার প্রতারণায় ভাটা পড়ায় কামরুল নতুন কৌশলে ভয়ংকর মাদক কারবারে নামেন। ঝিনাইদহ সীমান্ত এলাকাকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে নড়াইল, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং রাজধানী ঢাকায় মাদকের চালান পাঠাচ্ছিলেন তিনি। আর এসব চালানের প্রধান পরিবহনকারী ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত ও বিত্তশালী চালক ইমরান। উদ্ধার হওয়া ৫০ বোতল এস্কাফের চালানটিও সীমান্ত এলাকা থেকে ঢাকায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতারক ও মাদক সম্রাট কামরুল বর্তমানে নড়াইল এলাকায় গোপনে নতুন আস্তানা গেড়ে সেখান থেকেই পুরো অপরাধচক্র পরিচালনা করছেন। নিজের গাড়ি থেকে মাদকের চালান জব্দ ও কোটিপতি চালক ধরা পড়ার পরও কামরুল ইসলাম ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় নুরপুরসহ পুরো এলাকায় তীব্র অসন্তোষ ও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, চালক ইমরান তো কেবল একজন বাহক; এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল কলকাঠি নাড়ছেন কামরুল ইসলাম নিজে। কেবল একটি গাড়ি জব্দ বা চালককে আটক করাই যথেষ্ট নয়। কামরুলের চাকরি প্রতারণার মাধ্যমে কত কোটি টাকা হাতিয়েছেন এবং মাদকের মাধ্যমে কত অবৈধ সম্পদ গড়েছেন—তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে নেপথ্যের মূল কারিগর কামরুল ইসলামকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নড়াইল সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অজয় কুমার কুণ্ডু জানান, ‘চেকপোস্টে তল্লাশির সময় একটি প্রাইভেটকার থেকে ৫০ বোতল এস্কাফসহ একজনকে আটক করা হয়েছে। চালককে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই মাদক চেইনের গভীর সম্পৃক্ততা ও মূল চালিকাশক্তিদের বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং তদন্তের মাধ্যমে জড়িত সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে।’