
মোঃ সজিব সরদার,স্টাফ রিপোর্টারঃ পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও খালে জমছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও পচনশীল বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পলিথিন ও প্লাস্টিক। দুর্গন্ধে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
একই সঙ্গে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। অথচ উপজেলা সদরে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন কিংবা নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান নেই।দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে।
উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নতুন বাজার, পীরতলা বাজার, দুমকী থানার সংযোগ সড়ক, সৃজনী বিদ্যানিকেতন ব্রীজসংলগ্ন এলাকা এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম গেটের আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে এসব স্থানের কোনো কোনো অংশ কার্যত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় আবর্জনা জমে থাকছে দিনের পর দিন। দুর্গন্ধের কারণে এসব পথ দিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে দুর্ভোগপূর্ণ স্থানগুলোর একটি নতুন বাজারের পূর্ব প্রান্তে দুমকী-বাউফল মহাসড়কসংলগ্ন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম গেট এলাকা। সড়কের পাশেই জমেছে ময়লার বড় স্তূপ। আশপাশের বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এতে পথচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।একই পরিস্থিতি পীরতলা বাজারের পুরোনো থানা পুলসংলগ্ন এলাকায়। সেখানেও জমে থাকা পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
দুমকী থানায় প্রবেশের সংযোগ সড়কের পাশেও নির্বিচারে ময়লা ফেলার কারণে সৃষ্টি হয়েছে আবর্জনার স্তূপ। এ ছাড়া সৃজনী বিদ্যানিকেতন ব্রীজসংলগ্ন এলাকায় বাজারের বর্জ্য ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচ্ছিষ্ট ফেলে একাধিক স্থানে ময়লা জমিয়ে রাখা হয়েছে। এসব পথে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের নাক চেপে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া পীরতলা খালের অবস্থাও উদ্বেগজনক। লুথ্যারান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল এলাকা থেকে আঙ্গারিয়া পর্যন্ত খালের বিভিন্ন অংশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। বিশেষ করে পীরতলা বাজার ও আশপাশের এলাকার বর্জ্য খালে ফেলার কারণে দূষণ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দখল ও ভরাটের কারণে আগে থেকেই সংকুচিত হয়ে আসা খালটি এখন বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একসময় এর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলা সদরে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং নির্দিষ্ট স্থানে অপসারণের নিয়মিত ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় অনেকে সড়কের পাশ, খালি জায়গা কিংবা খালে ময়লা ফেলছেন। তবে অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাব এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতিকেও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক জসিম উদ্দিন বলেন, “প্রত্যেক বাসায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ময়লা তৈরি হয়। কিন্তু সেগুলো ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে কিংবা দিনের বেলায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। বিশেষ করে খালে ময়লা ফেলার প্রবণতা বেশি।
পীরতলা বাজারের ব্যবসায়ী শাহীন মৃধা বলেন, “মানুষ প্রতিনিয়ত খালে ময়লা ফেলছেন। যাঁদের বাসা খাল থেকে কিছুটা দূরে, তাঁরা বাড়ির গলির খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলছেন। একজনকে দেখে আরেকজন একই কাজ করছেন। এভাবে পুরো গলি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। এখন এলাকার বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
পবিপ্রবি শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, “এখানে দু-একজন নয়, অনেকেই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। কারণ, এলাকায় ডাস্টবিন নেই। বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ এভাবে ময়লা ফেলছেন, যা পরিবেশ দূষিত করছে।
উন্মুক্ত স্থানে পচনশীল বর্জ্য জমে থাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের বর্জ্য মশা-মাছির বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বৃষ্টির পানিতে আবর্জনা ছড়িয়ে পড়লে নালা ও জলাশয় দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে সংক্রমণ ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
দুমকী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর শহীদুল হাসান বলেন, “মেডিকেল বর্জ্য ফেলার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি যথাযথভাবে কাজে আসছে না।
মেডিকেল বর্জ্যও পরিবেশদূষণের কারণ হচ্ছে।
দুমকী পৌরসভা হলে হয়তো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতো। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় সাধারণ মানুষ ক্রমেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। দুমকীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এখন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে উপজেলা সদরে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পাশে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন করতে হবে।
পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ, উপযুক্ত স্থানে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র স্থাপন এবং খাল ও সড়কের পাশে ময়লা ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
দুমকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে এসব বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ বেশ ব্যয়বহুল। আগে বর্জ্য অপসারণে দূরদর্শী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া হলেও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান ও নিয়মিত অপসারণের ব্যবস্থা না থাকলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কীভাবে? তাঁদের প্রত্যাশা, আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু হলে একদিকে যেমন পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে দুমকী সদরও ফিরে পেতে পারে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য জনপদের পরিবেশ।