সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বোরো ফসলের রক্ষাকবচ ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে পাহাড়সম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বোরো ফসলের রক্ষাকবচ ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে পাহাড়সম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগী ও ভূমিমালিক কৃষকদের বাদ দিয়ে পকেট কমিটি গঠনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হরিলুটের পাঁয়তারা চলছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এমনকি সরেজমিন তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অকৃষকদের নিয়ে কমিটি অনুমোদনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, যে এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হবে, সেই এলাকার জমির মালিক এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী কৃষকদের নিয়ে ৫ থেকে ৭ সদস্যের পিআইসি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু শাল্লা উপজেলায় এবার তার চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার ১০৮, ১০৯, ১১৮, ১৪, ৩৩, ১৮, ১১৯, ৭০ ও ২২ নম্বরসহ অসংখ্য প্রকল্পে প্রকৃত কৃষকদের কোনো স্থান হয়নি। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা হয়েছে, যাদের প্রকল্প এলাকায় কোনো জমিই নেই।
সবচেয়ে আলোচিত অনিয়মটি ঘটেছে ১০৮নং পিআইসিভুক্ত প্রকল্পে। কালিনিকোটা হাওর উপ-প্রকল্পের ‘হাওয়ার খালের পর হইতে সাপুড়িয়ার পর পর্যন্ত’ বাঁধের ভাঙন মেরামত কাজে এই কমিটি গঠন করা হয়। ভুক্তভোগী কৃষক খন্দকার হাবিব জানান, এই প্রকল্পের পুরো বাঁধটিই তাঁর এবং তাঁর আপন ভাইদের পৈতৃক ও রেকর্ডীয় জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের মাটিও সরবরাহ করতে হবে তাঁদের জমি থেকে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সব তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সময়মতো আবেদন করার পরও গত ২ জানুয়ারি প্রকাশিত তালিকায় আমাদের নাম রাখা হয়নি। উল্টো তদন্তে এসে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম সব দেখে যাওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে অকৃষকদের নিয়ে কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই অবৈধ কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
উপজেলা পিআইসি বাস্তবায়ন কমিটির এক সদস্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “কমিটিতে থাকা সত্ত্বেও ইউএনও আমাদের কোনো মূল্যায়ন করেননি। মিটিং শুরু হওয়ার আগেই আমাদের স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়া হয়। ২৫ ও ৯৩ নম্বর প্রকল্প থেকে টাকার বিনিময় করা হয়েছে। এই তথ্য ইউএনও-কে জানানোর পরও তিনি রহস্যজনক কারণে প্রকল্পগুলো স্থগিত করেননি। এছাড়া ৪৫ ও ৯৮ নং প্রকল্প থেকে ৩ লক্ষ টাকাসহ আরও অনেক প্রকল্প থেকে টাকা নিয়েছেন পাউবো কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোঃ রাশেদুল ইসলাম।”
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ৭০ নং পিআইসির সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিক্রিত সম্পত্তির ফর্চা জালিয়াতি করে পিআইসি বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া নীতিমালায় স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও শাল্লার অনেক প্রকল্পে পার্শ্ববর্তী উপজেলার বাসিন্দাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাইরের লোক দিয়ে কাজ করালে তারা দায়সারাভাবে কাজ শেষ করে টাকা নিয়ে সটকে পড়বে, আর বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবলে তার মাশুল দিতে হবে স্থানীয়দেরই।
অনিয়মতান্ত্রিক এই কমিটিগুলো বাতিল এবং পুনর্গঠনের দাবিতে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং উপজেলা কাবিটা কমিটির সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। আবেদনের অনুলিপি জেলা প্রশাসক ও পাউবোর ঊর্ধ্বতন মহলেও পাঠানো হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এবার যেভাবে প্রকৃত মালিকদের বাদ দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ করা হয়েছে, তা বিগত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কৃষকদের হুঁশিয়ারি—হাওরের ফসলই তাদের সারা বছরের একমাত্র জীবিকা। যদি অযোগ্য ও দুর্নীতবাজদের দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তবে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে ফসলের মহাবিপর্যয় ঘটতে পারে। দ্রুত দাবি মানা না হলে তারা কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সদুত্তর মেলেনি। তবে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কোনো প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও মাঠপর্যায়ে কাজের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রশাসনের এমন আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না শংকিত কৃষকরা।




















