ফেনীর নতুন এসপিকে ঘিরে ‘ভাইরাল’ অপপ্রচার
- Update Time : ০৬:৫২:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
- / ১২৬ Time View

মোহাম্মদ হানিফ,স্টাফ রিপোর্টার ফেনী:
অভিযোগের দিন ঢাকায় প্রশিক্ষণে ছিলেন মাহবুব আলম খান — সরকারি নথিতে মিললো স্পষ্ট প্রমাণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে একটি পুরোনো অভিযোগ। লক্ষ্যবস্তু— সদ্য দায়িত্ব পাওয়া ফেনী জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মাহবুব আলম খান।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কিছু বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে দাবি করা হয়, ২০১৬ সালের একটি আলোচিত ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য।
সরকারি নথিপত্র বলছে, অভিযোগের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেনই না। বরং ওই সময় ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজে সরকারি প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলেন।
এ তথ্য সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের সময় কোথায় ছিলেন মাহবুব আলম খান?
প্রাপ্ত সরকারি নথি অনুযায়ী, মোঃ মাহবুব আলম খান ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত
“30th Police Financial Management Certificate Course”-এ অংশগ্রহণ করেন।
অথচ সামাজিক মাধ্যমে যেই ঘটনার অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ আগস্ট ২০১৬।
অর্থাৎ অভিযোগের দিন তিনি ঢাকায় প্রশিক্ষণে ব্যস্ত ছিলেন— এমনটাই প্রমাণ মিলেছে অফিসিয়াল ডকুমেন্টে।
সরকারি নথিতে কী পাওয়া গেছে?
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা নথিপত্রে দেখা যায়—
পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ থেকে জারি করা অফিসিয়াল চিঠিতে প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকায় মোঃ মাহবুব আলম খানের নাম রয়েছে।
কোর্স শেষে তাকে আনুষ্ঠানিক Release Certificate প্রদান করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণের নির্ধারিত সময়কালও নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একজন কর্মকর্তা যখন আবাসিক প্রশিক্ষণে অংশ নেন, তখন নির্ধারিত সময়জুড়ে তাকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেই থাকতে হয়। ফলে অভিযোগে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সময়রেখা বিশ্লেষণেই মিলছে বড় অসংগতি
টাইমলাইন এক নজরে
১৪ আগস্ট ২০১৬ — ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণ শুরু
১৭ আগস্ট ২০১৬ — অভিযোগে উল্লেখিত ঘটনার তারিখ
১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ — প্রশিক্ষণ সমাপ্ত
এই সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, অভিযোগের দিন তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—
যদি একজন কর্মকর্তা সরকারি প্রশিক্ষণে ঢাকায় অবস্থান করেন, তাহলে একই সময়ে অন্য জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনায় তাকে জড়ানোর ভিত্তি কী?
সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে কেন পুরোনো অভিযোগ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় পুরোনো বা অসম্পূর্ণ তথ্য নতুন প্রেক্ষাপটে ভাইরাল করা হয়। এতে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
বিশেষ করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ দায়িত্ব পেলে তাকে ঘিরে নানা ধরনের প্রচারণা শুরু হওয়াও নতুন কিছু নয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফেনীর পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মাহবুব আলম খানকে নিয়েও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে।
চট্টগ্রামে দীর্ঘ কর্মজীবন, প্রশাসনিক রেকর্ডেও মিলছে তথ্য
পুলিশ সূত্রে জানা যায়,
২০২২ সালের ২০ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (CMP) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে যোগ দেন।
এরপর ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি চট্টগ্রামেই কর্মরত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র আরও জানায়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতেও তিনি চট্টগ্রামেই দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক রেকর্ড যাচাই করলেই এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা
পুলিশ প্রশাসনের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অতীতে তিনি একাধিকবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন।
এমনকি পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য—
যদি তিনি রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত প্রভাবশালী বা বিশেষ মহলের ঘনিষ্ঠ হতেন, তাহলে আগের সরকার আমলেই গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এসপি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
‘যাচাই ছাড়া প্রচারণা বিপজ্জনক’ — সচেতন মহলের উদ্বেগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
তাদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনার আগে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন—
“মানুষ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যকে অনেক সময় সত্য হিসেবে ধরে নেয়। তাই কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে সঠিক তথ্য যাচাই করা খুবই জরুরি।”
বর্তমানে ফেনীর পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খান
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোঃ মাহবুব আলম খান বর্তমানে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে সরকারি নথি, প্রশাসনিক রেকর্ড ও সময়রেখা বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব।
তাদের দাবি—
“তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে অপপ্রচার অনেকটাই কমে আসবে।”

















